আনিষা চৌধুরী, কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গের (West Bengal) সাধারণ মানুষের কাছে সরকারি পরিষেবা আরও সহজে পৌঁছে দিতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার (Government of West Bengal)। আগের ‘জনকল্যাণ শিবির’ বা JKS-এর পরিবর্তিত রূপ হিসেবেই এবার শুরু হচ্ছে ‘সেবা সেতু অভিযান’ (Seva Setu Abhiyan)। চলতি বছরে আগামী ২ অক্টোবর থেকে ৪ অক্টোবর এই তিন দিন রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় আয়োজিত হবে বিশেষ একক-উইন্ডো আউটরিচ শিবির। এই শিবিরগুলিতে একই জায়গা থেকে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের একাধিক জনমুখী প্রকল্পের বিষয়ে আবেদন, যাচাই এবং পরিষেবা পাওয়ার সুযোগ থাকবে।
সকল স্তরের মানুষের জন্য সমান সুযোগ
রাজ্যজুড়ে মোট ৩,১০৪টি শিবির আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। ছাত্রছাত্রী, যুবসমাজ, কৃষক, শ্রমিক, মহিলা-সহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ তাঁদের প্রয়োজন ও যোগ্যতা অনুযায়ী সরকারি প্রকল্পের সুবিধা নেওয়ার জন্য এই শিবিরে যোগাযোগ করতে পারবেন। শুধু নতুন করে আবেদন নয়, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে নথি যাচাই, রেজিস্ট্রেশন, পরিষেবা প্রদান এবং অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থাও থাকবে এই উদ্যোগের আওতায়।
কৃষি সংক্রান্ত সুবিধা
কৃষকদের জন্য কৃষি দফতরের আওতায় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের পরিষেবা মিলবে। এর মধ্যে রয়েছে পিএম-কিষান সম্মান নিধি, কিষান ক্রেডিট কার্ড বা কেসিসি, সয়েল হেলথ কার্ড এবং এগ্রিকালচার ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফান্ড বা এআইএফ। যোগ্য কৃষকরা সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলির জন্য শিবিরে গিয়ে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার সুযোগ পাবেন।
অনগ্রসর শ্রেণির জন্য প্রকল্প
অনগ্রসর শ্রেণির ছাত্রছাত্রী ও পরিবারের জন্যও থাকছে একাধিক সুবিধা। প্রি-ম্যাট্রিক ও পোস্ট-ম্যাট্রিক স্কলারশিপ, শিক্ষাশ্রী, মেধাশ্রী এবং তপশিলি বন্ধু প্রকল্পের মতো পরিষেবাগুলি সম্পর্কে আবেদন ও প্রয়োজনীয় যাচাইয়ের সুযোগ মিলবে শিবিরে।
অর্থ ও ব্যাংকিং পরিষেবা
ব্যাংকিং ও আর্থিক পরিষেবার ক্ষেত্রেও একাধিক কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সুবিধা পাওয়া যাবে। প্রধানমন্ত্রী জনধন যোজনা, পিএম জীবন জ্যোতি বিমা যোজনা, পিএম সুরক্ষা বিমা যোজনা, অটল পেনশন যোজনা এবং মুদ্রা ঋণের মতো প্রকল্পের জন্য যোগ্য ব্যক্তিরা শিবিরে প্রয়োজনীয় তথ্য ও পরিষেবা নিতে পারবেন।
মৎস্য ও খাদ্য সংক্রান্ত পরিষেবা
মৎস্যচাষ ও খাদ্য সরবরাহ দফতরের অধীনে থাকছে পিএম-মৎস্য কিষান সমৃদ্ধি সহ-যোজনা। পাশাপাশি পিএম গরিব কল্যাণ অন্ন যোজনা, রাজ্য খাদ্য সুরক্ষা যোজনা-১ এবং পিএম উজ্জ্বলা যোজনার মতো প্রকল্পের সুবিধা নিয়েও শিবিরে যোগাযোগ করা যাবে।
খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ও উদ্যানপালন
খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ এবং উদ্যানপালনের সঙ্গে যুক্ত মানুষদের জন্যও থাকছে সরকারি প্রকল্পের পরিষেবা। মিশন ফর ইন্টিগ্রেটেড ডেভেলপমেন্ট অফ হর্টিকালচার বা এমআইডিএইচ এবং পিএম ফর্মালাইজেশন অফ মাইক্রো ফুড প্রসেসিং এন্টারপ্রাইজেস বা পিএমএফএমই প্রকল্প এই শিবিরের তালিকায় রয়েছে।
স্বাস্থ্য ও উচ্চশিক্ষা
স্বাস্থ্য ও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও নাগরিকরা একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের বিষয়ে পরিষেবা পাবেন। এর মধ্যে রয়েছে আয়ুষ্মান ভারত এবং ওয়েস্ট বেঙ্গল স্টুডেন্ট ক্রেডিট কার্ড। যোগ্য পড়ুয়া ও নাগরিকরা সংশ্লিষ্ট পরিষেবা সম্পর্কে আবেদন ও যাচাইয়ের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারবেন।
স্বরাষ্ট্র ও শ্রম সংক্রান্ত পরিষেবা
আধার এনরোলমেন্ট ও সিডিং, সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট বা সিএএ-র আবেদন, ই-শ্রম এবং পিএম শ্রম যোগী মানধনের মতো পরিষেবাও থাকছে। এর পাশাপাশি বিনা মূল্যে সামাজিক সুরক্ষা যোজনা বা বিএমএসএসওয়াই এবং ওয়েস্ট বেঙ্গল মাইগ্র্যান্ট ওয়ার্কার্স ওয়েলফেয়ার স্কিমের সুবিধা সম্পর্কেও পরিষেবা মিলবে।
জমি ও সংখ্যালঘু কল্যাণ
জমি সংক্রান্ত কাজের জন্যও শিবিরে যোগাযোগ করা যাবে। জমির রেকর্ডে মিউটেশন, মাইনর কারেকশন এবং পাট্টার জন্য আবেদন করা যাবে। সংখ্যালঘু ছাত্রছাত্রীদের জন্য প্রি-ম্যাট্রিক ও পোস্ট-ম্যাট্রিক স্কলারশিপের পাশাপাশি পিএম-বিকাশ বা প্রধানমন্ত্রী বিরাসত কা সম্বর্ধন যোজনার পরিষেবাও এই উদ্যোগের আওতায় থাকছে।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কারিগর এবং উদ্যোগপতিদের জন্যও থাকছে একাধিক সুযোগ। পিএম-বিশ্বকর্মা, প্রাইম মিনিস্টার এমপ্লয়মেন্ট জেনারেশন প্রোগ্রাম বা পিএমইজিপি এবং উদ্যম রেজিস্ট্রেশনের মতো পরিষেবা পাওয়া যাবে সেবা সেতু শিবিরে।
বিদ্যুৎ, পঞ্চায়েত ও দক্ষতা উন্নয়ন
বিদ্যুৎ, পঞ্চায়েত এবং দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রেও রয়েছে একাধিক প্রকল্প। পিএম সূর্য ঘর যোজনা, স্বচ্ছ ভারত মিশন-আইএইচএইচএল, স্বনির্ভর গোষ্ঠীর জন্য ক্রেডিট লিঙ্কেজ এবং জব কার্ড সংক্রান্ত পরিষেবা পাওয়া যাবে। পাশাপাশি দীনদয়াল উপাধ্যায় গ্রামীণ কৌশল্য যোজনা বা ডিডিইউ-জিকেওয়াই, ন্যাশনাল অ্যাপ্রেন্টিসশিপ প্রোমোশন স্কিম বা ন্যাপস/ন্যাটস, প্রাইম মিনিস্টার ইন্টার্নশিপ স্কিম এবং উৎকর্ষ বাংলা/রোজগার সেবা পোর্টালের মতো উদ্যোগের পরিষেবাও থাকছে।
আদিবাসী, পুরসভা ও নারী-শিশু কল্যাণ
আদিবাসী সম্প্রদায়, শহরাঞ্চলের মানুষ এবং নারী-শিশুদের জন্যও একাধিক প্রকল্পের সুবিধা মিলবে। শিক্ষাশ্রী ও জয় জোহার, পিএম-স্বনিধি, প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা-আরবান, অন্নপূর্ণা যোজনা, সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনা এবং কন্যাশ্রী যোজনা/বেটি বচাও যোজনার মতো প্রকল্পের পরিষেবা এই শিবিরগুলিতে পাওয়া যাবে।
কী কী নথি সঙ্গে নিয়ে যাবেন?
প্রকল্প অনুযায়ী প্রয়োজনীয় নথির তালিকা আলাদা হতে পারে। তাই শিবিরে যাওয়ার সময় আধার কার্ড, ভোটার কার্ড, রেশন কার্ডের মতো পরিচয়পত্রের আসল কপি এবং জেরক্স সঙ্গে রাখা ভালো। পাশাপাশি ব্যাংক পাসবুক, যাতে অ্যাকাউন্ট নম্বর ও আইএফএসসি কোড পরিষ্কারভাবে রয়েছে, সাম্প্রতিক পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী জাতিগত শংসাপত্র ও শিক্ষাগত যোগ্যতার নথি রাখতে হবে। জমি সংক্রান্ত পরিষেবা নিতে গেলে জমির দলিল, পর্চা বা খতিয়ানের মতো প্রয়োজনীয় কাগজও সঙ্গে রাখা দরকার।
আরও পড়ুন: ভারতকে ঘিরে নতুন ছক? চিনে প্রশিক্ষণ নিতে যাচ্ছেন বাংলাদেশ সেনার ৩ আধিকারিক
নিজের এলাকার শিবিরের ঠিকানা কীভাবে জানবেন?
নিজের এলাকার সেবা সেতু শিবির কোথায় এবং কখন বসবে, তা জানতে সরকারি পোর্টালে গিয়ে ‘লোকেট আ শিবির’ অপশনটি দেখতে হবে। সেখানে জেলা, ব্লক এবং গ্রাম পঞ্চায়েত অথবা ওয়ার্ড নির্বাচন করলে নির্দিষ্ট এলাকার শিবিরের তারিখ ও স্থান সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যাবে। ফলে যাওয়ার আগে নিজের এলাকার নির্দিষ্ট শিবিরের জায়গা ও সময় দেখে নেওয়া সুবিধাজনক।










