ছিলেন ১০০ দিনের কাজের মজুর, আজ জয়েন্ট BDO হয়ে ‘জিরামজি’র দায়িত্বে সৌরভ

Published:

Success Story of Joint BDO Sourav Pal

অনন্যা সরকার, কলকাতা: কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা নিজের ভাগ্য নিজের হাতেই লেখেন। চরম প্রতিকূল পরিস্থিতি থেকেও মাথা তুলে দাঁড়ানোর মনের জোর, নিষ্ঠা ও পরিশ্রম করার ক্ষমতা থাকে তাঁদের। তারই প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলেন বীরভূমের দুবরাজপুরের যুগ্ম বিডিও সৌরভ পাল (Success Story)। একটা সময় সংসারের খরচ চালানোর জন্য নিয়মিত ১০০ দিনের প্রকল্পে (আগের MGNREGA) শ্রমিক (Worker) হিসেবে কাজ করতেন। আর এখন ব্লক স্তরে সেই প্রকল্পেরই (এখনকার VB-G RAM G) দায়িত্ব তাঁর কাঁধে।

অভাব অনটনের মধ্যেও স্বপ্নের লালন

মুর্শিদাবাদের তেঁতুলিয়া গ্রামের এক প্রান্তিক পরিবার বড় হয়ে ওঠা সৌরভ পালের। তিন ভাইয়ের বোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট। বাবার একটি ছোট্ট চায়ের দোকান থেকে যা উপার্জন হতো, তাতেই চলতো সংসার। একবেলা খাবার জুটলেও, পরের বেলা কী করে চলবে, তা নিয়েই চিন্তা থাকতো অধিকাংশ দিন। এই অভাবে জীবনে বড় কিছু করার জেদটা বাড়িয়ে দিয়েছিল সৌরভের। 

আরও পড়ুন: NIA-র ধাঁচে বাংলায় এবার SIA, নিরাপত্তা জোরদারে বড় সিদ্ধান্ত সরকারের

জুলাই মাসের শুরুর দিকে রাজ্য জুড়ে শুরু হয় ‘বিকশিত ভারত গ্যারান্টি ফর রোজগার অ্যান্ড আজীবিকা মিশন (গ্রামীণ)’ সংক্ষেপে ভিবি-জি রাম জি প্রকল্প। দুবরাজপুর ব্লকের ১০টি পঞ্চায়েতের সাতটিতেই চলছে প্রকল্পের কাজ। এই প্রকল্পেরই ব্লক নোডাল অফিসারের দায়িত্বে রয়েছেন তিনি। দুবরাজপুর পঞ্চায়েতে যখন কাজের উদ্বোধনে হল সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তিনি। ১০০ দিনের কাজে তাঁর জবকার্ডের ছবিও শেয়ার করে সমাজমাধ্যমে সৌরভ লেখেন, ‘স্মৃতি ভোলা যায় না, নতুন দায়িত্ব কেবল তার উপরে নতুন পরত মাত্র। সংগ্রামের দিনগুলোই আজকের পথ চলার সবচেয়ে বড় শক্তি।’

উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতির দিনগুলোতে পড়াশোনার পাশাপাশি, ১০০ দিনের কাজে নিজেও খেটেছেন সৌরভ। তারপর ২০১৯ সালে পদার্থবিদ্যায় সাম্মানিক স্নাতক চলাকালীন পাড়ার এক শিক্ষক, শ্যামসুন্দর প্রামাণিক সৌরভকে ডব্লিউবিসিএস (WBCS) পরীক্ষায় বসার জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। সৌরভ পালের মনে স্বপ্ন জাগে গেজেটেড অফিসার হওয়ার। কিন্তু সংসারের হাল ধরতে প্রথমে গ্রামীণ ডাক সেবক, পরে ক্লার্কশিপ পরীক্ষা দিয়ে বন বিভাগের ক্লার্ক পদে যোগ দেন। সৌরভ ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত উত্তরবঙ্গ ও বীরভূমের বন বিভাগে কাজ করেছেন। 

আরও পড়ুন: খামারে কাজ করেন মা, ছেড়ে গিয়েছেন বাবা! NEET-এ অভাবনীয় সাফল্য বীরভূমের যুবকের

বনবিভাগে কর্মরত থাকাকালীন শ্যামসুন্দরবাবুর কাছে কোচিং নিতে প্রতি সপ্তাহে মুর্শিদাবাদে নিজের বাড়িতে ফিরতেন সৌরভ। ২০২২ সালের ডব্লিউবিসিএস-এর ‘গ্রুপ সি’ (Group C) পরীক্ষায় পাস করেন। বীরভূমের ডিএফও (DFO) রাহুল কুমার তাঁকে ইন্টারভিউয়ের প্রস্তুতিতে অনেক সাহায্য করেছেন বলে জানান সৌরভ। এরপরই, দুবরাজপুরে যুগ্ম বিডিও পদে চাকরি পান তিনি। সৌরভের গাইড ও অগ্রজস্বরূপ শ্যামসুন্দর প্রামাণিক অবশ্য সমস্ত কৃতিত্বটাই সৌরভের দিকে ঠেলে দিয়ে বলেন, তিনি পথ দেখিয়েছে মাত্র। কৃতিত্ব সৌরভের। গ্রামের একটা সাধারণ পরিবারের ছেলে হয়ে তিনি আজ যে সাফল্য অর্জন করেছেন, সেটা আরো অনেক ছেলে-মেয়ের কাছে অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে। সৌরভ চান, সরকারি প্রকল্পগুলির সাহায্যে যেন অর্থনৈতিক উন্নতি হয় গরীব মানুষগুলির। সৌরভ পালের এই সাফল্য প্রমাণ করে, প্রতিকূলতা যতই আসুক, নিষ্ঠা থাকলে ও কঠোর পরিশ্রম করলে জীবনের ঠিকই সফল হওয়া যায়।