“লক্ষীর ভাণ্ডার”-এর বদলে “লাখপতি দিদি”,
“যুব সাথী”-র বদলে “উৎসাহ ভাতা”,
“জয় শ্রী রাম”-এর বদলে “জয় মা কালী”
এবার বাংলা জয় করতে এক বা দুই নয়, একেবারে ৭ দফা নীতি প্রয়োগ করল বিজেপি (BJP)। নেওয়া হল এমন সিদ্ধান্ত, যার ফলে পায়ের তলার মাটিই সরে যাবে তৃণমূল কংগ্রেসের। একদিকে মজবুত হবে বিজেপি-র জমি, বাড়বে ভোটব্যাঙ্ক, তেমনই অন্যদিকে নিঃশব্দে তিলে তিলে শেষ হবে TMC। একদিকে করা হবে বাংলার মা-বোনেদের বিশ্বাস অর্জন, তেমনই অন্যদিকে ভাতা দিয়ে নয়, যোগ্য করে কর্মসংস্থান দেওয়া হবে বাংলার প্রত্যেক
চলুন, আজ India Hood ডিকোড-এ আমরা তুলে ধরবো এক এক করে BJP-র এমন সাতটি মাস্টারপ্ল্যান, যা আগে কোনোদিন বাংলায় প্রয়োগ করেনি বঙ্গ বিজেপি! তাই ধৈর্য ধরে লেখাটি শেষ পর্যন্ত পড়ুন।
একদিকে SIR, তো অন্যদিকে হাইকোর্টের রায়!
একদিকে SIR, তো অন্যদিকে CAA-র বিশেষ কমিটি, আবার ভোটের আগেই কেন্দ্রীয় বাহিনী, তার ওপর হাইকোর্টে রায় – একপ্রকার নাজেহাল অবস্থাতেই রয়েছে বাংলার তৃণমূল সরকার। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই এক চুলও জমি ছাড়তে নারাজ বিজেপি। আর তাই এবার বাংলা জয় করতে সাতটি নয়া পদক্ষেপ নিল বিজেপি।
প্রথম পদক্ষেপ – লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের বিকল্প লাখপতি দিদি!
লক্ষ্মীর ভাণ্ডার যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটা বিশাল মাস্টারস্ট্রোক সে কথা মানতেই হবে। আর এবার ভোটের আগে সেই টাকা আরও ৫০০ করে বাড়িয়ে দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী যে বড় দাঁও মেরেছেন সেটাও অনস্বীকার্য।
আর তাই এবার, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের চালেই বাংলায় মাত দিতে চলেছে বিজেপি-র নেতৃত্বরা। এবার ভারতীয় জনতা পার্টি দাবি করেছে, তারা ক্ষমতায় এলে এই অনুদান বাড়িয়ে সরাসরি ৩ হাজার টাকা করা হবে। এই একই ঘোষণা করেছেন শুভেন্দু অধিকারী থেকে শুরু করে সুকান্ত মজুমদাররা!
অন্যদিকে, চালু করা হবে মোদী সরকারের একটি জনপ্রিয় এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রকল্প “লাখপতি দিদি”! যেখানে মেয়েদের স্বনির্ভর হওয়ার জন্য, নিজেদের ব্যবসা করার জন্য ১ লক্ষ টাকা করে দেওয়া হবে। অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন বাজেট ২০২৬-এ নারী ও লাখপতি দিদিদের জন্য C-Mart প্রকল্প শুরু করার কথা বলেছেন। যেখানে সরকারের উচ্চাকাঙ্ক্ষী লাখপতি দিদি প্রকল্পকে আরও সম্প্রসারণের ঘোষণা করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন, লাখপতি দিদিদের পণ্য বিক্রির জন্য দেশজুড়ে আরও রিটেল আউটলেট খোলা হবে। এর মাধ্যমে নারীরা সরাসরি বাজারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে স্থায়ী আয় বাড়াতে পারবেন।
আর এই গেম যে বিজেপির জন্য বড়সড় গেমচেঞ্জার হতে পারে সে কথা বলাই বাহুল্য।
দ্বিতীয় পদক্ষেপ – যুব সাথীর বিকল্প ‘উৎসাহ ভাতা’!
এবার ভোটের আগে যুব সমাজকে নিজেদের দিকে টানার জন্য আর এক মাস্টারস্ট্রোক হিসাবে যুব সাথী প্রকল্প চালু করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই প্রকল্পের আওতায় রাজ্যের বেকার যুবক এবং যুবতীদের মাসে ১,৫০০ টাকা করে দেওয়া হবে। আর এর ফলে যে বেকার যুবক-যুবতীদের ভোট তৃনমূলের ঢুকবে এটাই স্বাভাবিক।
কিন্তু, লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মতো এবার যুব সাথীর বিকল্প নিয়েও তৈরি বিজেপি। নাম ‘উৎসাহ ভাতা’। বছরে দেওয়া হবে ২৫ হাজার টাকা করে! তবে, নামে ভাতা থাকলেও দান খয়রাতি কিংবা ভাতা হিসাবে এই টাকা দেওয়া হবে না। বরং ১৮ থেকে ৪০ বছর বয়সী বেকারদের দক্ষতা প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়ার জন্য এই টাকা দেওয়া হবে। তবে, প্রশিক্ষণ মাঝপথে ছেড়ে দিলেই বন্ধ হয়ে যাবে ভাতা। বিজেপির উদ্দেশ্য স্পষ্ট—“শুধু ভাতা নয়, চাই দক্ষতা… চাই কর্মসংস্থান।”তাই প্রশিক্ষিত যুবশক্তি তৈরি করে শিল্প ও বিনিয়োগ টানাই তাদের লক্ষ্য।
তবে, শুধু তাই নয়, বাংলার যুব সমাজের জন্য পাঁচ বছরে এক কোটি চাকরির প্রতিশ্রুতিও রয়েছে বিজেপির ইস্তেহারে।
তৃতীয় পদক্ষেপ – ‘জয় শ্রী রাম’ শ্লোগান বদলে গেল ‘জয় মা কালী’-তে
আমরা বিজেপি বলতেই বুঝি – “জয় শ্রী রাম”। কিন্তু, গত কয়েক বছরে এই শ্লোগানে যে শিকে ছেঁড়েনি তা দেখে নিয়েছে বিজেপি-র নেতৃত্বরা! আর তাই এবার পুরো ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে মা কালীতে ভরসা রাখলেন মোদী-শমীকরা।
হ্যাঁ ঠিকই শুনেছেন। আর এই কথা আমরা বলছি না। এই কথা শোনা যাচ্ছে বিজেপি নেতৃত্বদের মন্তব্যেই!
দিনটা ১৭ই জানুয়ারি। ভোটের আগে মালদার বুকে দাঁড়িয়ে দেশের প্রথম বন্দে ভারত স্লিপার ট্রেন উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। আর সেদিনই নিজের ভাষণের মাঝে উঠে আসে “জয় মা হ্যান্টা কালী” ধ্বনী।
এরপরেই সম্প্রতি বাংলা বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগেই পশ্চিমবঙ্গে ভোটারদের উদ্দেশে খোলা চিঠিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী লেখেন “জয় মা কালী”!
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এটা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, বিজেপির “জয় শ্রী রাম” মন্ত্র মূলত উত্তর ও পশ্চিম ভারতের রাজ্যগুলিতে বেশি সাড়া ফেলেছিল। আবার ওড়িশায় ভোটের আগে যেমন ‘জয় জগন্নাথ’ সাড়া ফেলেছিল। তাই এবার বাংলায় বিধানসভা নির্বাচনের আগে ‘জয় মা কালী’ দিয়ে নিজেদের নতুন করে মেলে ধরতে চাইছে বিজেপি।
চতুর্থ পদক্ষেপ – উত্তরবঙ্গের জন্য একাধিক প্যাকেজ
লোকসভা নির্বাচন হোক কিংবা বিধানসভা নির্বাচন, পশ্চিমবঙ্গে উত্তরবঙ্গ বরাবরই বিজেপি-র একটি শক্ত ঘাঁটি। কিন্তু গত কয়েক বছরে সেখানে প্রচুর ভুয়ো ভোটার এবং অনুপ্রবেশকারীদের ঢুকিয়ে ভোটকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে তৃণমূল, এমন দাবী করা হচ্ছে বিজেপি নেতৃত্বের তরফ থেকে।
আর সে কথা যে ঠিক তা হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া গেল, SIR-এর খসড়া তালিকা প্রকাশ হতেই। কারণ সারা বাংলায় যেখানে SIR-এর খসড়া তালিকায় বাদ গিয়েছে প্রায় ৫৮ লক্ষের নাম, সেখানেই শুধুমাত্র উত্তর বঙ্গ থেকে বাদ গিয়েছে প্রায় ৯ লক্ষ ৩৪ হাজার ৭২২ জনের নাম। অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ১৬ শতাংশ। এই সংখ্যা চূড়ান্ত তালিকা বেরোলে যে আরও বাড়বে তা বলাই বাহুল্য।
তাই, একদিকে যেমন ভুয়ো ভোটার ছাঁটছে SIR, তেমনই অন্যদিকে এবার নিজেদের জমি শক্ত করার লক্ষ্যে – ৫০ লক্ষ পরিবারের কাছে পৌঁছানোর পরিকল্পনা করছে বিজেপি। শুরু করেছে গৃহ সম্পর্ক অভিযান। বের করতে চাইছে শিলিগুড়ি থেকে কোচবিহার পর্যন্ত রথযাত্রা।
এছাড়াও, উত্তরবঙ্গের জন্য একটি AIIMS, একটি IIT, একটি ম্যানেজমেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়, ক্যানসার গবেষণা কেন্দ্র চালু করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে এবারের ইস্তেহারে।
পঞ্চম পদক্ষেপ – CPIM-এর ভোটব্যাঙ্ক কবজা!
এবারের বিধানসভা নির্বাচন হবে হাড্ডাহাড্ডি! কারণ একদিকে সিপিআইএম ছেড়ে তৃনমূলে যোগ দিয়ে ইতিমধ্যেই বাংলা কাঁপাচ্ছেন প্রতীক উর রহমান, আবার অন্যদিকে হুমায়ুন কবীরের সাথে লুকিয়ে বৈঠক করছেন সিপিআইএম নেতা মহম্মদ সেলিম।
তাই সিপিআইএম-এর জনপ্রিয়তা কমুক কিংবা বাড়ুক, কিন্তু তাদের ভোটব্যাঙ্ক যা বিজেপিতে এসেছে গত কয়েক বছর ধরে তা যেন হাতছাড়া না হয় – এবার জেলা সভাপতিদের উদ্দেশ্যে সেই ফরমানই জারি করেছে রাজ্য নেতৃত্ব! জানিয়েছে, সিপিএম থেকে আসা ভোটব্যাঙ্ক ধরে রাখতেই হবে। তার জন্য নীচুতলায় নিবিড় যোগাযোগ বাড়াতে হবে। কোনও অবস্থাতেই সিপিএমের ভোটব্যাঙ্ক ফিরে যেন না যায়।
কারণ তথ্য বলছে, ২০১৬ সালে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে CPIM-এর ভোটের শেয়ার ছিল ১৯.৮ শতাংশ আর BJP-র মাত্র ১০.২ শতাংশ। আর ২০২১ সালে এই পরিমাণটা কত হয়েছে জানেন? CPIM পেয়েছে মাত্র ৪.৭৩ শতাংশ ভোট আর BJP ৩৮.১৩ শতাংশ ভোট। অর্থাৎ, কেন এই ফরমান জারি করা হয়েছে তা এই সংখ্যা থেকেই স্পষ্ট তাই নয় কি?
ষষ্ঠ পদক্ষেপ – মাঠে নামছে “মহিলা বিস্তারক”
গত বারের ভুল ত্রুটি যাতে আর না হয়, এবার সেই লক্ষ্যে শুধু নেতাদের নয় নেত্রীদেরও বাংলায় নামাচ্ছে বিজেপি। তাও আবার ভিনরাজ্য থেকে এনে। হ্যাঁ ঠিকই শুনেছেন, এবার বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিহার, ঝাড়খণ্ড এবং উত্তরপ্রদেশের মহিলা ব্রিগেড আনছে বিজেপি।
শুধু আসছে তাই নয়, কৌশলগতভাবে যে সমস্ত বিধানসভা কেন্দ্রগুলিতে বিজেপি-র জেতার সম্ভাবনা রয়েছে সেই সমস্ত জায়গাগুলিতে ঘুরে ঘুরে কাজ করবে ও প্রচার চালাবেন এই মহিলারা। পাশাপাশি মেয়েদের নিরাপত্তা, বিজেপি শাসিত অন্যান্য রাজ্যের মেয়েরা কীভাবে উন্নতি করছে – সেই সবকিছুই তারা তুলে ধরবে। আর সেই লক্ষ্যে প্রতিটি বিধানসভা পিছু দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তিনজন করে নেত্রীকে। আর ইতিমধ্যেই তাঁরা নাকি ঘুরে ঘুরে কাজও শুরু করে দিয়েছেন।
সপ্তম পদক্ষেপ – পরিবর্তন যাত্রা!
সালটা ২০২১। বঙ্গে ক্ষমতায় আসার জন্য বিজেপি চালু করেছিল ‘যোগদান মেলা’। যেখানে তৃণমূল-বাম-কংগ্রেসের নেতাকর্মীদের বিজেপি-তে গণযোগদানের আয়োজন করা হয়েছিল। রাজ্যের নানা প্রান্তে সে ‘মেলা’ হয়েছিল।
আর এবারের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপির হাতিয়ার ‘নেতার মেলা’। কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক নাম ‘পরিবর্তন যাত্রা’। আর সেই উপলক্ষে আগামী ১লা এবং ২রা মার্চ একসঙ্গে এত হেভিওয়েট বিজেপি নেতা-মন্ত্রীরা পশ্চিমবঙ্গে এসেছেন, তেমনটা আগে কখনও দেখেনি বাংলা!
যেমন ধরুন রায়দিঘি থেকে ১লা মার্চ ‘পরিবর্তন যাত্রা’-র সূচনা করলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তথা দলের প্রাক্তন সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহ। ওইদিন নদিয়ার কৃষ্ণনগর থেকে ‘যাত্রা’-র উদ্বোধন করলেন আর এক প্রাক্তন সর্বভারতীয় সভাপতি কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জগৎপ্রকাশ নড্ডা। ২রা মার্চ হাওড়ার আমতায় ‘যাত্রা’-র উদ্বোধন করলেন দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংহ।
বিজেপির বর্তমান সর্বভারতীয় সভাপতি নিতিন নবীনও ওই উদ্বোধন পর্বের দু’দিনই রাজ্যে ছিলেন। তবে দু’দিনই তিনি ছিলেন উত্তরবঙ্গে। প্রথম দিন তিনি কোচবিহার শহর থেকে একটি ‘যাত্রা’-র উদ্বোধন করেছেন। পরের দিন উত্তর দিনাজপুরের ইসলামপুর থেকে আর একটির উদ্বোধন করলেন
১লা মার্চ পশ্চিম মেদিনীপুরের গড়বেতা থেকে ‘যাত্রা’ উদ্বোধন করলেন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। একই দিনে আসানসোলের কুলটি থেকে আর একটি ‘যাত্রা’র উদ্বোধন করলেন কেন্দ্রীয় নারী ও শিশুকল্যাণ মন্ত্রী অন্নপূর্ণা দেবী। ২রা মার্চ বীরভূমে ‘পরিবর্তন যাত্রা’র উদ্বোধনে ছিলেন মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফডণবীস। আর গত কয়েক বছরে রাজ্য রাজনীতিতে বহুচর্চিত সন্দেশখালি থেকে ওই দিনই আর একটি ‘যাত্রা’-র উদ্বোধন করলেন কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রী শিবরাজ সিংহ চৌহান।
অর্থাৎ এক নয়, দুই নয় – একসাথে সাতটি মাস্টারস্ট্রোক নিয়ে হাজির বিজেপি। আপনার কি মনে হয় এই প্ল্যানে কি বাংলা জয় করতে পারবে বিজেপি? জানাতে ভুলবেন না আপনার মতামত কমেন্ট করে।












