সৌভিক মুখার্জী, কলকাতা: আধুনিকতার ছোঁয়ায় মানুষের জীবন বদলে গেলেও ভারতের কিছু কিছু জায়গায় এমন কিছু ঐতিহ্য আজও পর্যন্ত বেঁচে রয়েছে, যার শিকড় খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। তেমনই একটি বিস্ময়কর উৎসব হল হিমাচল প্রদেশের ‘রাউলানে’ (Raulane)। স্থানীয়রা বিশ্বাস করেন যে, এই উৎসব প্রায় ৫০০০ বছরের পুরনো, যা ইতিহাসের লিখিত নথিরও বহু আগে। তবে এই উৎসবের মাহাত্ম্য সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে অবশ্যই পড়ুন প্রতিবেদনটি।
কোথায় হয় এই উৎসব?
প্রথমেই জানিয়ে দিই, হিমাচল প্রদেশের কিন্নর জেলার কালপা এবং তার আশেপাশার গ্রামগুলিতে প্রতিবছর বসন্ত ঋতুর শুরুতে এই উৎসব উদযাপন করা হয়। বরফ গলতে শুরু করলেই পাহাড়ে নতুন জীবনের যেমন ছোঁয়া লাগে, ঠিক তেমনই গ্রামবাসীরা একত্রিত হয় এই বিশেষ অনুষ্ঠানে। জানা যায়, রাউলানে উৎসবের কোনও নির্দিষ্ট লিখিত ইতিহাস নেই। এমনকি কোনও ধর্মীয় গ্রন্থে উল্লেখ নেই। আর নেই কোনও কাহিনী। তবে স্থানীয়রা বিশ্বাস করেন যে, এটি এমন এক সময়ের ঐতিহ্য, যখন ধর্মলোকে বিশ্বাস আর দৈনন্দিন জীবন একসঙ্গে মিশে ছিল। আর এই উৎসবের জন্ম হয়েছিল প্রকৃতি এবং অদৃশ্য শক্তির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর জন্যই।
সাউনি পাহাড়ের অদৃশ্য রক্ষকের সাথে যোগসূত্র
এদিকে এই উৎসবের মূল বিশ্বাস জড়িয়ে রয়েছে সাউনি নামের একটি পাহাড়ি আত্মা বা পরীদের সঙ্গেই। গ্রামবাসীরা মনে করেন যে, এই আত্মারা শীতকালে তাদেরকে রক্ষা করে। আর পশুপালন, ফসল এবং যাত্রাপথে সাহায্য করে। রাউলানে মূলত এই সাউনির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশেরই একটি উৎসব। এমনকি উৎসবের সবথেকে আকর্ষণ দুটো চরিত্র। প্রথমটি রাউলা যিনি একজন জ্ঞানী পুরুষ, আর দ্বিতীয় রাউলানে যিনি কনের রূপ। তবে এটিও একজন পুরুষ অভিনয় করেন। আর এই জুটি কোনও বাস্তবের বিবাহ নয়, বরং মানুষ ও প্রকৃতির মিলনের প্রতীক আর পুরুষ এবং নারীর শক্তি সমন্বয়ের প্রতীক।
এদিকে রাউলা ও রাউলানের পোশাকে থাকে ফুলের মুকুট, ঐতিহ্যবাহী গয়না। সম্পূর্ণ ঢাকা মুখে মানুষের পরিচয় মুছে নিজেদের ঐতিহ্য রক্ষা করেন তাঁরা। আর উৎসবের দিন ঢাকঢোলের শব্দে বিশেষ শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। তাতে থাকে রাউলা ও রাউলানে, জানপুন্ডুলু নামের মুখোশধারী রক্ষক, যারা অশুভ শক্তি তাড়ায় আর পুরো গ্রামবাসী। সকলে মিলে এদিন নাগিন নারায়ণ মন্দিরে যান।
আরও পড়ুন: ভোটের আগে অন্য খেলা! শুভেন্দু হাইকোর্টে যেতেই শোরগোল
নৃত্যের মাধ্যমে বিদায়
তবে মন্দিরে পৌঁছে ধীরগতির একটি বিশেষ নৃত্য অনুষ্ঠিত হয়। আর এই নৃত্যের মাধ্যমেই সাউনিদের বিদায় জানানো হয় এবং ভালো ফসল, সুরক্ষা ও শান্তির জন্য প্রার্থনা করা হয়। গ্রামবাসীরা বিশ্বাস করেন, এই সময় মানুষ এবং অদৃশ্য জগতের দূরত্ব কমে যায়। এমনকি আজকের দিনে যখন মোবাইল, ইন্টারনেট বা শহরের জীবনযাত্রা গ্রামাঞ্চলকেও প্রভাবিত করছে, তখন এই রাউলানে উৎসব সম্পূর্ণ ইতিহাসের ধারা বজায় রেখেছে। আর এটি শুধুমাত্র কোনও উৎসব নয়, বরং এটি ঐতিহ্য পরম্পরার এক বিশ্বস্ত প্রতীক।












