ভারতের একমাত্র রাজ্য যা স্বাধীনতার ২৮ বছর পর হয় দেশের অংশ, কীভাবে যুক্ত হল জানেন?

Published:

Indian History of Sikkim Inclusion

অনন্যা সরকার, কলকাতা: ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ছিল সেই ঐতিহাসিক দিন, যেদিন প্রায় ২০০ বছরের পরাধীনতা শিকল ভেঙে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি পায় ভারতবর্ষ। কিন্তু সেই সময় এমন একটি রাজ্য ছিল, যা তখনও ভারতের অংশ ছিল না। দেশের স্বাধীনতার ২৮ বছর পর এটি ভারতের অংশ হয়। এই রাজ্যটি হল সিকিম (Sikkim)। ১৯৭৫ সালে সংবিধানের ৩৬তম সংশোধনের পর সিকিমকে ভারতের ২২তম রাজ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাই সিকিমের ইতিহাস ভারতের অন্য সব রাজ্যের ইতিহাসের (Indian History) থেকে অনেকটা আলাদা। রাজতন্ত্রকে বিদায় জানিয়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলন থেকে ভারতের সাথে যুক্ত হওয়ার এই যাত্রাপথে জড়িয়ে রয়েছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনা। চলুন তাহলে আজ এই প্রতিবেদনে সিকিম ও তার সংক্ষিপ্ত ইতিহাসের (Sikkim History) উপর চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক।

স্বাধীনতার ২৮ বছর পর দেশের অংশ হল সিকিম

ভারতের বিদ্যমান সমস্ত রাজ্যগুলি ১৯৪৭-এ স্বাধীনতার সময়ে ইউনিয়নে যোগ দেয়নি, সিকিম ছিল এর মধ্যে অন্যতম। স্বাধীনতার পরও, হিমালয়ের কোলে গড়ে ওঠা এই পৃথক রাজ্যটি প্রায় তিন দশক ধরে চোগিয়াল রাজবংশের শাসনাধীন ছিল। ১৯৭৫ সালের ১৬ মে-এর ঐতিহাসিক গণভোট এবং ৩৬তম সাংবিধানিক সংশোধনের (36th Amendment) পরেই সিকিম আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের ২২তম রাজ্যে পরিণত হয়। সুতরাং, সিকিমের অন্তর্ভুক্তি ও রাজনৈতিক যাত্রা এদেশের ইতিহাসে একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

আরও পড়ুন: বাংলায় ১৭ টি নতুন রেল রুটের কাজ শুরু, কোথায় কোথায়? প্রকাশ্যে এল তালিকা

১৬৪২ সালে যখন ইউকসমে ফুন্টসোগ নামগ্যাল প্রথম চোগিয়াল ( সিকিমি ভাষায় রাজা) হিসেবে নিযুক্ত হন, তখন থেকেই সিকিমের লিখিত ইতিহাসের সূচনা হয়েছিল। তাঁর হাত ধরেই নামগ্যাল রাজবংশের সূচনা হয়, যারা প্রায় তিন শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এই হিমালয় রাজ্য শাসন করেন। লেপচা, ভুটিয়া এবং পরবর্তীতে নেপালি সম্প্রদায় সিকিমের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক পরিচয়ে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। এই রাজ্যের ঐতিহ্য, বৌদ্ধ মঠ এবং উৎসবগুলিতে আজও সংস্কৃতির এই অনন্য মিশ্রণ দেখতে পাওয়া যায়।

অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে, সিকিম নেপাল ও ভুটানের সাথে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। হিমালয়ের জনপদগুলিতেও ব্রিটিশরা তাঁদের প্রভাব বাড়াতে  থাকে এবং সিকিম ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করে। পরবর্তীকালে এটিও একটি ব্রিটিশ আশ্রিত রাজ্যে পরিণত হয়েছিল, যেখানে রাজতন্ত্র বজায় থাকলেও বৈদেশিক বিষয়ে ব্রিটিশদের উল্লেখযোগ্য প্রভাব ছিল। ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত এই ব্যবস্থা একইভাবে বজায় ছিল। 

আরও পড়ুন: জানেন কোন পাহাড়ি এলাকাকে দক্ষিণ ভারতের ‘কাশ্মীর’ বলে?

অধিকাংশ রাজ্যের মতো, সিকিম ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পরে সঙ্গে সঙ্গে ভারতে যোগ দেয়নি। ১৯৫০ সালের ভারত-সিকিম চুক্তি অনুসারে, সিকিমকে ভারতের একটি আশ্রিত রাজ্য বানানো হয়েছিল। এই চুক্তি অনুযায়ী, ভারত শুধুমাত্র এই রাজ্যের প্রতিরক্ষা, যোগাযোগ ও পররাষ্ট্র নীতির দায়িত্ব পায়, অন্যদিকে চোগিয়াল বা রাজা সিকিমের অভ্যন্তরীণ প্রশাসন নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখেন। ফলে সিকিম প্রায় তিন দশক সময় ধরে ভারতীয় ইউনিয়ন থেকে রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন ছিল।

এরপর, ১৯৭০-এর দশকের গোড়ায় সিকিমে শুরু হয় গণতান্ত্রিক সংস্কার এবং রাজ্যের রাজনীতিতে জন অংশগ্রহণের দাবি বাড়তে থাকে। ১৯৭৫ সালে অনুষ্ঠিত হয় একটি গণভোট, যেখানে অধিকাংশ ভোটারই চোগিয়াল রাজতন্ত্রের বিলুপ্তি ঘটিয়েবারাজ্যটিকে ভারতের সঙ্গে যুক্ত করার প্রস্তাবকে সমর্থন জানায়। গণভোটের পর, ১৯৭৫ সালের ৩৬তম সাংবিধানিক সংশোধনী আইন পাস ভারতীয় সংসদে এবং সেবছর ১৬ মে থেকে সিকিম আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের ২২তম রাজ্যের স্বীকৃতি পায়।

আরও India Sikkim