আনিষা চৌধুরী, কলকাতা: অনেক মানুষের মনেই নজর বা কুনজর নিয়ে একটা গভীর বিশ্বাস রয়েছে। তাই নিজেদের বাড়ি, পরিবার, ব্যবসা কিংবা প্রিয় জিনিসকে অন্যের খারাপ দৃষ্টি থেকে রক্ষা করতে নানা ধরনের টোটকা মেনে চলেন অনেকে। সেই প্রচলিত রীতিগুলির মধ্যে অন্যতম হল বাড়ির সদর দরজা, দোকান কিংবা গাড়িতে লেবু-লঙ্কা (lemon and chillies) ঝুলিয়ে রাখা। শুধু বাংলায় নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্তেই এই দৃশ্য চোখে পড়ে। নতুন বাড়ি তৈরি, নতুন ব্যবসা শুরু কিংবা নতুন গাড়ি কেনার পরে অনেকে এই রীতি পালন করেন। তাঁদের বিশ্বাস, এর মাধ্যমে অশুভ শক্তি, নেতিবাচক প্রভাব এবং অন্যের ঈর্ষাপূর্ণ দৃষ্টি থেকে নিজেদের সম্পত্তি ও সংসারকে সুরক্ষিত রাখা যায়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই প্রথা আজও মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে।
কেন এই টোটকায় এত বিশ্বাস মানুষের?
হিন্দু লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এর সঙ্গে অলক্ষ্মী বা জ্যেষ্ঠার ধারণাও জড়িয়ে রয়েছে। দেবী লক্ষ্মীর বিপরীত স্বরূপ হিসেবে অলক্ষ্মীকে দারিদ্র্য, দুর্ভাগ্য ও অশান্তির প্রতীক মনে করা হয়। প্রচলিত বিশ্বাস, লেবু ও লঙ্কার মাধ্যমে তাঁকে বাড়ির প্রবেশপথেই সন্তুষ্ট করে আটকে রাখা যায়, ফলে সংসারের ভিতরে অশুভ প্রভাব প্রবেশ করতে পারে না। ব্যবসায় বারবার বাধা, আর্থিক ক্ষতি কিংবা উন্নতিতে সব ধরনের বাধা-বিপত্তি কাটাতেও অনেকে এই টোটকার উপর ভরসা রাখেন।
লেবু ও লঙ্কাকেই কেন বেছে নেওয়া হয়?
এর পিছনেও রয়েছে প্রচলিত ধর্মীয় ও লোকবিশ্বাস। লেবুর টক স্বাদ এবং লঙ্কার ঝাল ও তীব্র গন্ধকে অশুভ শক্তি দূরে রাখার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। লোককথা অনুযায়ী, অলক্ষ্মী টক, ঝাল ও কটু স্বাদের খাবার পছন্দ করেন। তাই বাড়ির প্রবেশপথে লেবু-লঙ্কা ঝুলিয়ে রাখলে তিনি সেখানেই থেমে নিজের পছন্দের খাবার গ্রহণ করবেন এবং বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করবেন না। অন্যদিকে, অনেকের ধারণা, লেবু-লঙ্কা নেতিবাচক শক্তি ও অন্যের কুদৃষ্টিকে নিজের দিকে টেনে নেয়। সেই কারণেই বাড়ি, দোকান, অফিস থেকে শুরু করে নতুন কেনা গাড়িতেও এই উপকরণ ঝুলিয়ে রাখার রীতি প্রচলিত হয়েছে।
কীভাবে পালন করলে কার্যকরী হবে এই টোটকা?
জ্যোতিষশাস্ত্রের কিছু প্রচলিত নিয়ম মেনে এই টোটকা পালন করেন অনেকে। বিভিন্ন প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর জন্য প্রয়োজন সাতটি লঙ্কা, তিনটি পাতিলেবু, হলুদ সুতো এবং সামান্য হলুদ গুঁড়ো। প্রথমে হলুদ সুতোয় একটি লঙ্কা বাঁধতে হয়। এরপর মন্ত্র উচ্চারণ করতে করতে পর্যায়ক্রমে একটি পাতিলেবু ও তিনটি করে লঙ্কা সুতোর মধ্যে গেঁথে নিতে হয়। সবশেষে লেবু-লঙ্কার উপর হলুদ গুঁড়ো ছড়িয়ে সদর দরজায় ঝুলিয়ে দিতে হয়। এই সময় বগলামুখী মন্ত্র যথা, ‘ওঁ হ্রিং বগলামুখী স্বাহা’ অথবা ‘ওঁ হ্লীং বগলা মুখী স্বাহা’ উচ্চারণ করার কথা বলা হয়েছে। মানুষের বিশ্বাস, এই নিয়ম পালন করলে কুনজর থেকে রক্ষা, অশুভ শক্তির প্রভাব দূর, ব্যবসায় বাধা কাটানো এবং সংসারে সুখ-সমৃদ্ধি বজায় রাখতে সাহায্য মেলে। তবে বিভিন্ন অঞ্চলে এই রীতির উপকরণ ও নিয়মের কিছু পার্থক্য রয়েছে।
আরও পড়ুন: বন্ধ থাকবে সবকিছু, ২ ও ৩ নভেম্বর ফের ব্যাঙ্ক ধর্মঘটের ডাক কর্মী সংগঠনের
তবে লেবু-লঙ্কা ঝোলানোর এই প্রথা নিয়ে মানুষের মধ্যে মতপার্থক্যও রয়েছে। অনেকেই একে নিছক অন্ধবিশ্বাস বলে মনে করেন। তাঁদের মতে, দরজায় লেবু-লঙ্কা ঝুলিয়ে রাখলেই কারও কুনজর আটকানো কিংবা ব্যবসার আর্থিক সমস্যা দূর করা সম্ভব, এমন কোনও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। অন্যদিকে, বহু মানুষ এই প্রথাকে ধর্মীয় বিশ্বাস, পারিবারিক ঐতিহ্য এবং দীর্ঘদিনের সংস্কারের অংশ হিসেবে দেখেন। তাঁদের কাছে এটি শুধুমাত্র একটি টোটকা নয়, বরং নিজেদের ঘরবাড়ি, পরিবার ও কর্মক্ষেত্রের মঙ্গল কামনায় পালন করা একটি গুরুত্বপূর্ণ রীতি। ফলে এই বিজ্ঞাননির্ভর যুগেও আজও অনেকে যথেষ্ট নিষ্ঠার সঙ্গে লেবু-লঙ্কা ঝুলিয়ে রাখেন।










