অনন্যা সরকার, উত্তরপ্রদেশ: অনেকসময় জীবনে এমন পরিস্থিতি আসে যখন মানুষের দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যায়। সেই অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়ানো অসম্ভব মনে হয়। কিন্তু যারা কঠিন পরিস্থিতিতেও সব প্রতিকূলতা কাটিয়ে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেন, তারাই সমাজের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠেন। এমনই এক সংগ্রামের গল্প হল কিঞ্জল সিং-এর (UPSC Success Story of IAS Kinjal Singh)। তিনি উত্তরপ্রদেশ ক্যাডারের ২০০৮ সালের ব্যাচের একজন আইএএস অফিসার। আসুন তাঁর এই অসামান্য সাফল্যের কাহিনীটি সর্ম্পকে বিশদে জেনে নেওয়া যাক।
বাবার খুন, মায়ের ক্যান্সার দমাতে পারেনি কিঞ্জলকে
কিঞ্জল সিংয়ের বড় হয়ে ওঠা উত্তরপ্রদেশের বালিয়া জেলায়। তাঁর বাবা কেপি সিং ডিএসপি পদে কর্মরত ছিলেন। ১৯৮২ সালে কিঞ্জলের যখন ৬ মাস তখন হঠাৎই বিপর্যয় নেমে এল তাঁর পরিবারে। উত্তরপ্রদেশের গোন্ডা জেলায় তাঁর নিজের বিভাগেরই দুর্নীতিগ্রস্ত সদস্যদের দ্বারা সাজানো এক পুলিশ এনকাউন্টারে খুন হন তিনি। পুতুল খেলার বয়সেই কিঞ্জল তার মায়ের কোলে করে বালিয়া থেকে দিল্লি হয়ে সুপ্রিম কোর্টে যেত মামলার শুনানির জন্য। সারাদিন আদালতে বসে থাকতেন মায়ের সাথে। এভাবেই কেটেছে তাঁর ছেলেবেলা। মা বিভা সিংও ক্যান্সারের সাথে লড়াই করে ২০০৪ সালে পরলোক গমন করলেন। কেপি সিং-র মৃত্যুর সময় অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন বিভা দেবী। ছয় মাস পর আরেক কন্যাসন্তানের জন্ম দেন তিনি।
কিঞ্জলের বাবা, ডিএসপি কেপি সিং নিজেও একজন আইএএস অফিসার হতে চেয়েছিলেন। তার হত্যাকাণ্ডের কিছুদিন পর ইউপিএসসি (UPSC)-র ফলাফল ঘোষণা করা হয়, যেখানে দেখা যায় তিনি আইএএস মেইন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। কিঞ্জল এক সাক্ষাৎকারে বলেন, তাঁর মা যখন বলেছিলেন যে তিনি তার দুই মেয়েকে আইএএস অফিসার বানাবেন, তখন আশেপাশের লোকেরা তাকে নিয়ে হাসাহাসি করতো। মায়ের বেতনের একটি বড় অংশই মামলা-মোকদ্দমার ফি আর সংসারের খরচে চলে যেত।
আরও পড়ুন: RBI-র চাকরি সামলে UPSC ক্র্যাক, কোচিং ছাড়াই প্রথম অ্যাটেম্পটে IAS সৃষ্টি
ধীরে ধীরে কিঞ্জল ও তাঁর ছোটবোন প্রাঞ্জল বড় হয়ে উঠলেন। স্কুলের প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে কিঞ্জল দিল্লির শ্রী রাম কলেজে ভর্তি হন। ২০০৪ সালে, যে বছর তার মা মারা যান, সেই বছরই তিনি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন। এরই মধ্যে কিঞ্জল তার ছোট বোনকেও দিল্লিতে ডেকে নেন। দুই বোনই আইএএস পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি শুরু করেন। কিঞ্জল জানান, বাবার পর একমাত্র সম্বল মাকে হারিয়ে সেসময় দুজনেই পৃথিবীতে একা হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁরা কাউকে জানতে দিতে চাইননি যে, তাঁরা একা।
আরও পড়ুন: অষ্টম শ্রেণিতে হারান দৃষ্টিশক্তি, নোট সংগ্রহ করে পড়ান মা, UPSC ক্র্যাক করে ছেলে আজ IAS
প্রথমবারই অসফল হলেও, কিঞ্জল সিং ২০০৮ সালে দ্বিতীয় প্রচেষ্টায় ইউপিএসসি পরীক্ষার পাস করে ইন্ডিয়ান অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিসের (IAS) জন্য নির্বাচিত হন। সেই একই বছর, তাঁর ছোট বোন প্রাঞ্জলও ইন্ডিয়ান রেভিনিউ সার্ভিসের (IRS) জন্য নির্বাচিত হন। তাঁর এই সাফল্যের পিছনে মায়ের পর মামা-মামী ও ছোট বোন প্রাঞ্জলের অনেক ভূমিকা রয়েছে বলে জানান তিনি। বাধা-বিপত্তি, অঘটন ও প্রিয়জনকে হারানোর বেদনায় জর্জরিত হয়েও হার মানেননি কিঞ্জল সিং। আজ তাঁর এই সাফল্যের কাহিনী দেশের বহু ছাত্র-ছাত্রীকে অনুপ্রাণিত করে।










