আনিষা চৌধুরী, কলকাতা: একই ইংরেজি বছরে দু’বার ঈদ হতে পারলে দুর্গাপুজোই বা দু’বার হতে পারবে না কেন? ইসলাম ধর্মে প্রচলিত হিজরি চান্দ্র ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, ২০০০ সালেও একই ইংরেজি বছরে দু’বার ঈদুল ফিতর পালিত হয়েছিল। কারণ, চান্দ্র বছরের দৈর্ঘ্য ইংরেজি সৌর বছরের তুলনায় কম। এবার সেই প্রসঙ্গেই আলোচনায় ২০২৮ সালের দুর্গাপুজো। দুই পঞ্জিকার গণনায় বড়সড় ফারাক! একই ইংরেজি বছরে এবার দু’বার দুর্গোৎসব (Durga Puja)। প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৮ সালে দুই পুজোর মধ্যে ব্যবধান হতে পারে ১৫ দিন থেকে প্রায় তিন সপ্তাহ। কেন এমন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে? এর পিছনে কী ব্যাখ্যা দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা? চলুন, গোটা বিষয়টি একটু বিস্তারিতভাবে বুঝে নেওয়া যাক।
কী হতে চলেছে ২০২৮-এ?
বাংলায় মূলত দুটি পঞ্জিকা-গণনা অনুসরণ করে দুর্গাপুজোর দিনক্ষণ নির্ধারণ করা হয়। একটি হল দৃকসিদ্ধ বা বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত, অন্যটি সূর্যসিদ্ধান্ত বা গুপ্তপ্রেস পঞ্জিকা। এই দুই পদ্ধতিতে তিথি নির্ণয়ের গণনা এক নয়। বেলুড় মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশনের মতো প্রতিষ্ঠানে বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা অনুসরণ করা হয়। অন্যদিকে, বহু বনেদি বাড়ি এবং বারোয়ারি পুজোয় সূর্যসিদ্ধান্ত বা গুপ্তপ্রেস পঞ্জিকা মেনে দিনক্ষণ স্থির করা হয়। ফলে একই উৎসবের তিথি নির্ধারণে দুই পঞ্জিকার হিসাবে পার্থক্য দেখা দিতে পারে। ২০২৮ সালের দুর্গাপুজো নিয়ে জল্পনার মূল কারণও এই গণনার ফারাক।
দুই পঞ্জিকার হিসাব অনুযায়ী, ২০২৮ সালে দুর্গাপুজোর সময়ে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান তৈরি হতে পারে। বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা অনুযায়ী সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে, অর্থাৎ মাসের শেষ সপ্তাহে দুর্গোৎসব হওয়ার সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে। অন্যদিকে, সূর্যসিদ্ধান্ত বা গুপ্তপ্রেস পঞ্জিকা অনুযায়ী অক্টোবরের মাঝামাঝি দুর্গাপুজো হতে পারে বলে জানা যাচ্ছে। অর্থাৎ, একটি পঞ্জিকার হিসাবে যখন মঠ-মন্দিরে দুর্গাপুজোর আচার-অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়ে গিয়েছে, অন্য পঞ্জিকার হিসাবে তখনও পুজোর প্রস্তুতি চলছে।
এই সম্ভাবনা নিয়ে মুখ খুলেছেন সর্বভারতীয় প্রাচ্যবিদ্যা অ্যাকাডেমির অধ্যক্ষ ও শাস্ত্রজ্ঞ জয়ন্ত কুশারী। তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, তিথির স্থায়িত্ব ও গণনার পার্থক্যের কারণে কখনও কখনও দুই পঞ্জিকায় পুজোর দিনক্ষণ আলাদা হয়ে যেতে পারে। কোনও তিথি দু’দিন ধরে চললে বা তিথির সময়সীমায় উল্লেখযোগ্য পার্থক্য তৈরি হলে সেই প্রভাব পুজোর নির্ঘণ্টেও পড়ে। তাঁর বক্তব্যের মূল তাৎপর্য হল, দুই পঞ্জিকা অনুযায়ী পুজোর দিন আলাদা হলেও দুটির মধ্যে একটি পুজোকেও ভুল বলে ধরে নেওয়ার যায় না। অন্যদিকে, গুপ্তপ্রেস পঞ্জিকার কর্ণধার অরিজিৎ রায়চৌধুরী জানিয়েছেন, ২০২৮ সালের পুজোর নির্ঘণ্ট নিয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করার সময় এখনও আসেনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৭ সালের গণনার কাজই এখনও শেষ হয়নি। ফলে বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা ও সম্ভাব্য হিসাব সামনে এলেও ২০২৮ সালের দিনক্ষণ নিয়ে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক হবে না।
আরও পড়ুন: শ্রী ও লক্ষ্মী কি একই দেবী? জানুন পুরাণের সেই অজানা কাহিনি
তবে এমন ঘটনা বাংলার দুর্গোৎসবের ইতিহাসে একেবারে নজিরবিহীন নয়। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৮০ সালেও দুই পঞ্জিকার হিসাবে দুর্গাপুজো পালনের মধ্যে প্রায় এক মাসের ব্যবধান তৈরি হয়েছিল। সেই সময় এক পঞ্জিকার হিসাবে যখন মহালয়া পালিত হচ্ছিল, অন্য পঞ্জিকার হিসাবে তখন কালীপুজোর সময়। আবার এক পঞ্জিকা অনুযায়ী মহানবমীর সময় অন্য পঞ্জিকায় জগদ্ধাত্রী পুজো পালিত হচ্ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। জয়ন্ত কুশারীর ব্যাখ্যায়, অধিমাস বা মল মাসের হিসাবও এই ধরনের পরিস্থিতি তৈরির সঙ্গে সম্পর্কিত। সব মিলিয়ে, ২০২৮ সালের দুর্গাপুজো ঘিরে মানুষের কৌতূহল তুঙ্গে। তবে চূড়ান্ত নির্ঘণ্ট প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া গতি নেই।










