অনন্যা সরকার, কলকাতা: উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে অবস্থিত ‘কোল্ড ব্লব’ (Atlantic Cold Blob) নামে পরিচিত অস্বাভাবিক এক বিশাল শীতল জলরাশি ভারত ও পাকিস্তান সহ প্রতিবেশী দেশগুলির আবহাওয়া চক্রের দ্রুত পরিবর্তনের কারণ হয়ে উঠেছে। লাইভ সায়েন্সের (Live Science)-এর নতুন গবেষণা থেকে জানা গেছে যে, এই পরিবর্তন ভারত, পাকিস্তান ও তার পার্শ্ববর্তী দক্ষিণ এশিয়ায় বসবাসকারী ১০০ কোটিরও বেশি মানুষের জীবন-জীবিকা ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য এক গুরুতর অবস্থা তৈরি করতে চলেছে। ভারতের গ্রীষ্মকালীন মৌসুমি বায়ু সাধারণত জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সক্রিয় থাকে, যা উষ্ণ উত্তর ভারত মহাসাগর এবং শীতল ভূমধ্য সাগরের জলের মধ্যে তাপমাত্রার পার্থক্যের কারণে প্রবাহিত হয়। তবে, এই নতুন সামুদ্রিক সংযোগের আবিষ্কারের পর আবহাওয়াবিদরা আশা করছেন এবার থেকে দক্ষিণ এশিয়ার জলবায়ুগত ঘটনাগুলো ভালোভাবে বুঝতে পারা যাবে এবং আবহাওয়ার পূর্বাভাস উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হবে।
১৯৯৯ সাল থেকেই মৌসুমি বায়ুর আচরণে দেখা যাচ্ছে পরিবর্তন
‘এজিইউ অ্যাডভান্সেস’ জার্নালে প্রকাশিত জলবায়ু বিজ্ঞানীদের একটি গবেষণায় ১৯৯৯ সাল থেকে ভারতীয় মৌসুমি বায়ুর সাধারণ প্যাটার্নে একটি উল্লেখযোগ্য এবং উদ্বেগজনক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। গবেষকরা জানিয়েছেন যে, উত্তর-পশ্চিম ভারত এবং পাকিস্তানের কিছু অঞ্চলে এখন মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আগের চেয়ে ২৫ শতাংশ বেশি ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে। অন্যদিকে, দেশের সবচেয়ে উর্বর অংশ ইন্দো-গাঙ্গেয় সমভূমিতে মৌসুমি বৃষ্টিপাত প্রায় ৪ শতাংশ কমে গেছে। ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্সের জলবায়ু বিজ্ঞানী মহেন্দ্র নিম্মাকান্তি জানিয়েছে যে, এই পরিবর্তনটি ভারতীয় কৃষকদের জন্য অত্যন্ত দুশ্চিন্তার হতে পারে, কারণ এদেশের মাটি ও ফসল হাজার হাজার বছর ধরে চলা বৃষ্টিপাতের ধরনের সাথে খাপ খাইয়ে নিয়েছিল।
বিশেষজ্ঞরা মৌসুমি বায়ুর এই অদ্ভুত আচরণের সাথে আটলান্টিক মেরিডিওনাল ওভারটার্নিং সার্কুলেশন (AMOC)-এর পরিবর্তনের সংযোগ খুঁজে পেয়েছেন। এএমওসি হলো আটলান্টিক মহাসাগরের সমুদ্রস্রোতের এক বিশাল নেটওয়ার্ক, যা সারা বিশ্বের জলবায়ু এবং উত্তর গোলার্ধের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। বিশ্ব উষ্ণায়ন এই নেটওয়ার্কটিকে ধীর করে দিচ্ছে এবং গ্রিনল্যান্ডের দক্ষিণ-পূর্বের জল ক্রমাগত শীতল হয়ে একটি শীতল জলের পিণ্ড বা “কোল্ড ব্লব” তৈরি করছে। আরেক গবেষক ম্যাথিউ হুবার গবেষণা পত্র ব্যাখ্যা করেছেন যে, এই শীতল জলীয় পিণ্ডটি ইউরেশিয়ার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া জেট স্ট্রিম বায়ুপ্রবাহকে তীব্রতর করেছে এবং রাশিয়ার উরাল পর্বতমালার ওপর একটি প্রতিবন্ধক চাপ সৃষ্টি করেছে, যা আর্দ্র সামুদ্রিক বায়ুপ্রবাহকে উত্তর-পশ্চিম ভারত ও পাকিস্তানের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
আরও পড়ুনঃ ফুঁসছে নিম্নচাপ অক্ষরেখা, দক্ষিণবঙ্গের ৫ জেলায় সতর্কতা, আজকের আবহাওয়া
ভারত এবং তার প্রতিবেশী দেশগুলোর এক বিশাল জনগোষ্ঠী সম্পূর্ণরূপে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে সর্বদাই জল-সংকটপূর্ণ এবং শুষ্ক আবহাওয়ার জন্য উপযুক্ত ফসলের চাষ হয়। আর এখন অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কারণে এই অঞ্চলে ব্যাপক ফসলহানির আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে, প্রধান শস্য উৎপাদনকারী সমভূমিতে খরা পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ায় ফলন কমে যাচ্ছে। এই নতুন গবেষণাটি গ্লোবাল ওয়েদার মডেলগুলোর একটি ত্রুটি তুলে ধরেছে, যা এতদিন সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রাকে সম্পূর্ণরূপে বিবেচনা করতে ব্যর্থ হয়েছিল। এই নতুন আবিষ্কার ভারত ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলোতে বন্যা ও খরার পূর্বাভাস আরও ভালোভাবে দিতে সক্ষম করবে।










