আনিষা চৌধুরী, কলকাতা: শিক্ষা ব্যবস্থায় বড়সড় পরিবর্তনের ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী দিনে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকরা আর প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে (Politics) অংশ নিতে পারবেন না, এমনকি কোনও নির্বাচনে (Election) প্রতিদ্বন্দ্বিতাও করতে পারবেন না। এই ঘোষণাকে ঘিরেই শুরু হয়েছে বিতর্ক। সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আপত্তি জানিয়েছে একাধিক শিক্ষক সংগঠন।
বিতর্কের মুখে মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা
বুধবার রাজ্য মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর নবান্নে সাংবাদিক বৈঠক করে এই সিদ্ধান্তের কথা জানান মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর ঘোষণা অনুযায়ী, স্কুল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে ভবিষ্যতে যে শিক্ষক-শিক্ষিকারা নিয়োগ পাবেন, তাঁদের প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে অংশ নেওয়া এবং ভোটে দাঁড়ানোর সুযোগ থাকবে না। সেটা পঞ্চায়েত হোক বা পুরসভা, বিধানসভা কিংবা লোকসভা, কোনও নির্বাচনেই তাঁরা প্রার্থী হতে পারবেন না। সরকারি স্কুলের পাশাপাশি সরকার-পোষিত ও সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলের ক্ষেত্রেও এই নিয়ম কার্যকর করার কথা জানানো হয়েছে। শিক্ষার মান ফেরানো এবং শিক্ষকতার পেশার মর্যাদা রক্ষার যুক্তিতে এই সিদ্ধান্তের কথা বলেছেন তিনি।
মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণার পরই আপত্তি জানিয়েছে একাধিক শিক্ষক সংগঠন। বামপন্থী শিক্ষক সংগঠন এবিটিএ-র সাধারণ সম্পাদক সুজিত দাসের বক্তব্য, এই সিদ্ধান্তের বিষয়টি স্পষ্ট নয়। শিক্ষকরা কি কাজ ফাঁকি দিয়ে রাজনীতি করেন নাকি? প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। অন্যদিকে, শিক্ষানুরাগী ঐক্য মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক কিংকর অধিকারীর আশঙ্কা, এই সিদ্ধান্তের ফলে ভবিষ্যতে শিক্ষকদের প্রতিবাদ করার অধিকার ধীরে ধীরে কমে যাবে। বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির সাধারণ সম্পাদক স্বপন মণ্ডলও এই সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, অন্য রাজ্যের উদাহরণ দিয়ে বাংলার শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিষেধাজ্ঞা জারি করাকে কোনওভাবেই সমর্থন করা যায় না।
আরও পড়ুন: রায়গঞ্জে দ্বিতীয় AIIMS, শিলিগুড়ি পাচ্ছে ক্যানসার হাসপাতাল, প্রতিশ্রুতি রাখলেন মুখ্যমন্ত্রী
এই সিদ্ধান্ত নিয়ে যে প্রশ্ন ও সমস্যাগুলি সামনে এসেছে, সেগুলি হল–
- সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলের ক্ষেত্রে নিয়মের বৈধতা: গ্রান্ট-ইন-এড স্কুলের শিক্ষকরা সরকারি কর্মচারী নন। সেক্ষেত্রে তাঁদের উপর সরকার কীভাবে এই ধরনের নিষেধাজ্ঞা জারি করবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
- প্রতিবাদ করার অধিকার: শিক্ষকরা শিক্ষা ব্যবস্থা, নিজেদের পেশাগত সমস্যা কিংবা ন্যায্য দাবি নিয়ে সরব হলে, সেটিকেও প্রত্যক্ষ রাজনীতি হিসেবে বিবেচনা করা হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
- সরকারি ও সরকার-পোষিত স্কুলের নিয়ম: সরকারি স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীদের ক্ষেত্রে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিধিনিষেধ রয়েছে। ফলে নতুন নিয়মের পরিধি এবং প্রয়োগ কীভাবে হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
- অন্য রাজ্যের সঙ্গে তুলনা: অন্য রাজ্যে শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীরা সরকারি কর্মীর মর্যাদা পেয়ে থাকলে তাঁদের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ প্রযোজ্য হতে পারে। কিন্তু বাংলায় একই ধরনের নিয়ম কতটা যুক্তিসংগত, তা নিয়ে আপত্তি রয়েছে।
অন্যদিকে, মুখ্যমন্ত্রীর এই ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছে আরএসএস-সমর্থিত শিক্ষক সংগঠন এবিআরএসএম। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক বাপি প্রামাণিকের বক্তব্য, এই ভাবনা আজকের নয়, দীর্ঘদিনের। একাধিক রাজ্যে ইতিমধ্যেই এমন নিয়ম চালু রয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি। তাঁর মতে, এবার বাংলাতেও নতুন নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের সার্ভিস রুলে এই বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হবে। ফলে একদিকে শিক্ষক সংগঠনগুলির একাংশ সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা ও অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুললেও, অন্যদিকে আরএসএস-সমর্থিত সংগঠনটি শিক্ষকদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে মুখ্যমন্ত্রীর এই উদ্যোগকে সমর্থন জানিয়েছে।










