অনন্যা সরকার, বাঁকুড়া: কয়েক দশক আগেও এই গ্রামের পাশ দিয়ে ভয়ে ভয়ে যেতেন বহু মানুষ। কুখ্যাতি এতটাই ছড়িয়েছিল যে, আসল নামের বদলে, এটি ‘ডাকাতের গ্রাম’ নামেই বেশি পরিচিত ছিল। এখন বাঁকুড়ার এই অঞ্চলটির দুর্নাম ঘোচেনি, তবে গ্রামের বাসিন্দারা সেই তকমাটা মুছে ফেলতে চান। তাঁরা এখন চাইছেন ‘ডাকাতের গ্রাম’-এর বদলে সবাই তাঁদের গ্রামকে ‘ডাক্তারের গ্রাম’ হিসেবে চিনুক। আর তার কারণ হলেন এই গ্রামেরই বাসিন্দা, মেধাবী ছাত্র কালিমুল্লাহ মণ্ডল (Success Story of Kalimullah Mondal)। গ্রামের মধ্যে তিনিই প্রথমবারের জন্য নিট (NEET UG 2026) পরীক্ষায় সফল হয়েছেন। পরিবার পরিজনের পাশাপাশি, গ্রামের বাসিন্দারা তাঁর এই সাফল্যে উচ্ছ্বসিত।
কালিমুল্লাহর সাফল্যে আনন্দিত গোটা গ্রামবাসী
বাঁকুড়া জেলার ওন্ডা ব্লকের পুলিশোল গ্রামের বাসিন্দা কালিমুল্লাহ মণ্ডল থাকেন মুক্ষ্যাপাড়া এলাকায়। ছোট থেকেই পড়াশোনায় মেধাবী কালিমুল্লাহ নিট (NEET UG 2026) পরীক্ষায় ভালো ফল করেছেন। রাজ্যের মধ্যে তার র্যাঙ্ক ৮০০০। আর সর্বভারতীয় স্তরে তার র্যাঙ্ক ৫ লাখ। কালিমুল্লাহর বাবা বু আলী মণ্ডল এগ্রি মেকানিক্যাল বিভাগের একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও মা মোমিনা মণ্ডল একজন গৃহবধূ। ছেলের সাফল্যে খুবই খুশি বাবা-মা। এই খুশি তাঁরা ভাগ করে নিয়েছেন সকল গ্রামবাসীদের সাথেও। গত মঙ্গলবার কালিমুল্লাহ বাঁকুড়া সম্মিলনী মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি হয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন যে, এখন তাঁর লক্ষ্য একজন ভালো ডাক্তার হয়ে গ্রামের গরীব ও অভাবী মানুষদের বিনামূল্যে চিকিৎসা করা।
সন্তানের সাফল্যে গর্বিত বাবা-মা। মোমিনা মণ্ডল বলেন, ছেলেকে নিয়ে তাঁর অনেক স্বপ্ন ছিল। ছোটবেলা থেকেই সে পড়াশোনায় খুব মনোযোগী ছিল। পরিবারের অর্থনৈতিক অস্বচ্ছলতা দেখে কালিমুল্লাহ নিজেও কখনও কিছু চায়নি। সম্পূর্ণ নিজের চেষ্টায় পড়াশোনা করেছে। তিনি এও বলেন যে, নিট পরীক্ষায় ছেলের সাফল্য তাঁকে সবচেয়ে বেশি আনন্দ দিয়েছে। আমি চান কালিমুল্লাহ ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবা করুক।
আরও পড়ুন: বাবার ক্যান্সার, মা সেলাই করে চালান সংসার, অভাবকে সঙ্গী করে NEET ক্র্যাক, ডাক্তার হবেন সাগর
এর আগে পুলিশোল গ্রামের অনেকে সরকারি চাকরি পেলেও, এই প্রথম গ্রাম থেকে কেউ ডাক্তারি পড়ার সুযোগ পেল। কালিমুল্লাহ বাঁকুড়ার বঙ্গ বিদ্যালয় থেকে ৪৪০ নম্বর পেয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন। পাশাপাশি অনলাইনে পড়াশোনা করে নিটের জন্য প্রস্তুতি নিতেন। এর ফলও পেলেন হাতেনাতে। আগামী দিনে সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের নিটের প্রস্তুতিতে সহায়তা করতে চান কালিমুল্লাহ। তিনি আশা করেন, সুযোগের অভাবে কোনও মেধাবী ছাত্রছাত্রীর পড়াশোনা যেন থেমে না যায়।
আরও পড়ুনঃ হার মানাতে পারেনি অভাব ও ব্যর্থতা, কোচিং ছাড়াই UPSC ক্র্যাক করে IAS কৃষকের কন্যা
কালিমুল্লাহর এই সাফল্যের খবর জানার পর স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, গ্রামের পরিচিতি বদলাচ্ছে। ‘ডাকাতদের গ্রাম’ তকমা এবার গা থেকে মুছে যাবে। পুলিশোল গ্রাম থেকেই এখন ডাক্তার তৈরি হবে। কালিমুল্লাহর সাফল্য গোটা গ্রামের সাফল্য হয়ে উঠেছে। খবর ছড়িয়ে পড়তেই আনন্দ ভাগ করে নিতে প্রতিবেশীরা বাড়ির উঠোনে ভিড় জমান। কেউ তাকে অভিনন্দন জানান, কেউ মুখে তুলে দেন মিষ্টি। সন্তানের জন্য গর্বে ভরে ওঠে বাবা মায়ের বুক। মুখে হাসির সাথে চোখের কোণে চিক চিক করে ওঠে একফোঁটা আনন্দাশ্রু।










