বৈদিক গণিত থেকে চাণক্যনীতি, ইন্টার্নশিপ! বদলে যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম

Published:

mandatory-internship

আনিষা চৌধুরী, কলকাতা: এতদিন দেশের শিক্ষাব্যবস্থা মূলত ১৯৮৬ সালের জাতীয় শিক্ষানীতি, যা ১৯৯২ সালে সংশোধিত হয়েছিল, সেই কাঠামো অনুসরণ করে চলছিল। পরবর্তী সময়ে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বিভিন্ন পরিবর্তন এলেও পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য-সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে তিন বছরের স্নাতক পাঠক্রম এবং চয়েস বেসড ক্রেডিট সিস্টেম (CBCS) চালু ছিল। ২০২০ সালে কেন্দ্রীয় সরকার নতুন জাতীয় শিক্ষানীতি (National Education Policy 2020) ঘোষণা করলেও পশ্চিমবঙ্গে তা সম্পূর্ণভাবে কার্যকর হয়নি। তবে গত মে মাসে রাজ্যে সরকার (Government of West Bengal) পরিবর্তনের পর নতুন সরকার জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ অনুসরণ করেই রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা ঘোষণা করেছে। সেই অনুযায়ী এবার উচ্চশিক্ষার পাঠ্যক্রমেও একাধিক পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

নতুন শিক্ষানীতি প্রণয়নের লক্ষ্য কী?

আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে প্রাচীন ভারতীয় জ্ঞান, ঐতিহ্য এবং চিন্তাভাবনার মেলবন্ধন ঘটানোই এই নতুন পাঠ্যক্রম তৈরির অন্যতম উদ্দেশ্য। পাশাপাশি রাজ্যের সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের পঠনপাঠন, পাঠ্যক্রম এবং মূল্যায়ন পদ্ধতিতে সামঞ্জস্য আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে একটি অভিন্ন কাঠামো তৈরি করতে চাইছে রাজ্য। শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান নয়, পড়ুয়াদের ব্যবহারিক দক্ষতা, গবেষণার আগ্রহ এবং কর্মক্ষেত্রের উপযোগী অভিজ্ঞতা বাড়ানোর দিকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

নতুন পাঠ্যক্রমে কী কী পরিবর্তন আসতে চলেছে?

রাজ্যের সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নতুন পাঠ্যক্রমের কাঠামো তৈরির পাশাপাশি পঠনপাঠন ও মূল্যায়ন পদ্ধতিতেও একাধিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। সেগুলি হল–

  • বৈদিক গণিত ও চাণক্যনীতি: গণিতের পাঠ্যক্রমে বৈদিক গণিত এবং প্রাচীন ভারতীয় গণিতচর্চার বিভিন্ন পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থনীতির ক্ষেত্রে পড়ানো হতে পারে চাণক্যের অর্থনৈতিক চিন্তাভাবনা ও রাষ্ট্র পরিচালনার ধারণা। পাশাপাশি সাহিত্যের পাঠ্যক্রমেও জায়গা পেতে চলেছে প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্য।
  • সব বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিন্ন পাঠ্যক্রম: রাজ্যের সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় একই ধরনের পাঠ্যক্রম চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার মূল কাঠামোয় সামঞ্জস্য থাকবে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য বজায় রাখতে প্রস্তাবিত পাঠ্যক্রমের ২০-৩০ শতাংশ পর্যন্ত পরিবর্তন বা সংযোজনের স্বাধীনতা দেওয়া হবে।
  • বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ: নতুন ব্যবস্থায় ইন্টার্নশিপ বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতদিন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্টার্নশিপের সুযোগ থাকলেও তা বাধ্যতামূলক ছিল না। নতুন নিয়মে পড়াশোনার পাশাপাশি বাস্তব কর্মক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পাবেন পড়ুয়ারা।
  • দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা: শুধু বইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ব্যবহারিক জ্ঞান এবং পেশাগত দক্ষতা অর্জনের উপর জোর দেওয়া হবে। সংশ্লিষ্ট বিষয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্কিল বেসড লার্নিং বা দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
  • চার বছরের স্নাতক কোর্স: জাতীয় শিক্ষানীতি অনুযায়ী চার বছরের স্নাতক অনার্স কোর্স চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি চার বছরের অনার্স উইথ রিসার্চ কোর্সের উপরেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে স্নাতক স্তর থেকেই গবেষণামূলক পড়াশোনার সুযোগ বাড়বে।
  • ক্রেডিট ফ্রেমওয়ার্ক ও মূল্যায়ন পদ্ধতি: শুধু পাঠ্যক্রম নয়, বিভিন্ন কোর্সের ক্রেডিট নির্ধারণ এবং মূল্যায়ন পদ্ধতিতেও সামঞ্জস্য আনার পরিকল্পনা রয়েছে। সেই অনুযায়ী একটি অভিন্ন ক্রেডিট ফ্রেমওয়ার্ক তৈরির কাজ চলছে।

নতুন শিক্ষাকাঠামো বাস্তবায়নে তৈরি টাস্ক ফোর্স

জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ কার্যকর করার লক্ষ্যে রাজ্যের উচ্চশিক্ষা দফতরের উদ্যোগে একটি টাস্ক ফোর্স তৈরি করা হয়েছে। গত অগস্টে রাজ্যের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের নিয়ে উচ্চশিক্ষার পাঠ্যক্রম ও কারিকুলাম সংক্রান্ত একটি কমিটি গঠন করা হয়। ইতিমধ্যেই এই কমিটি নিজেদের কাজ শুরু করে দিয়েছে। রাজ্যের সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অভিন্ন পাঠ্যক্রমের কাঠামো তৈরি, ক্রেডিট ব্যবস্থা নির্ধারণ এবং পঠনপাঠন ও মূল্যায়ন পদ্ধতিতে সামঞ্জস্য আনার দায়িত্ব রয়েছে এই কমিটির উপর। উচ্চশিক্ষা দফতরের সঙ্গে সমন্বয় রেখেই গোটা প্রক্রিয়াটি এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কমিটিতে রয়েছেন কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য কল্লোল পালও।

আরও পড়ুন: মিডিয়ায় প্রকাশিত হচ্ছে ব্যক্তিগত তথ্য, অভিষেকের মামলা হাইকোর্টেই পাঠাল সর্বোচ্চ আদালত

এই উদ্যোগ প্রসঙ্গে কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য কল্লোল পাল জানিয়েছেন, রাজ্যের সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় রেখে জাতীয় শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তাঁরা কাজ করছেন। ইন্টার্নশিপ, ক্রেডিট ফ্রেমওয়ার্ক এবং ইন্ডিয়ান নলেজ সিস্টেম কার্যকর করা-সহ একাধিক বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছে। পাশাপাশি পাঠ্যক্রমেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি। নতুন এই ব্যবস্থা কার্যকর হলে একদিকে যেমন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার কাঠামোয় সামঞ্জস্য আসবে, অন্যদিকে পড়ুয়ারা ব্যবহারিক শিক্ষা, কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা এবং গবেষণার সুযোগ পাবেন। সব মিলিয়ে উচ্চশিক্ষাকে আরও দক্ষতাভিত্তিক ও কর্মমুখী করে তোলাই এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।

google button