দারিদ্রতার মাঝেও স্বপ্নপূরণ! ইতিহাসে JRF পেলেন আদিবাসী তরুণী, গর্বিত পুরুলিয়া

Published:

Purulia

প্রীতি পোদ্দার, কলকাতা: বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে সমাজ উন্নতির শিখরে পৌঁছলেও শিক্ষার আলো এখনও সব জায়গায় পৌঁছতে পারেনি। আর্থিক অভাব এবং দারিদ্রতা এখনও শিক্ষাকে শিকল দিয়ে বেঁধে রেখেছে। তবে সেই সকল ভাঙতে মরিয়া হয়ে উঠেছে বেশ কিছু মেধাবী। আর এবার ঘরের অভাব দূর করে এলাকার শিক্ষার বিস্তার ঘটানোর জন্য নয়া ইতিহাস গড়লেন এক আদিবাসী তরুণী। প্রথমবার জুনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ (Junior Research Fellowship) অর্জন করে নতুন দিগন্ত খুলে দিল পুরুলিয়ার (Purulia) ইতিহাস বিভাগের প্রাক্তন ছাত্রী কমলা বেসরা (Kamala Besra)।

উচ্চশিক্ষার আশা ছাড়েনি আদিবাসী তরুণী

বনমহল পুরুলিয়ার হুড়া ব্লকের লক্ষণপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের একেবারে প্রত্যন্ত গ্রাম দেউলির আদিবাসী তরুণী হলেন কমলা বেসরা। সেখানে ধারেকাছে কোনও বাস যাতায়াত করে না। কাজের সূত্রে তাই বাস ধরতে গেলে তিন কিলোমিটার পথ হেঁটে পুরুলিয়া-বাঁকুড়া ৬০-এ জাতীয় সড়কের কুলগোড়া মোড়ে যেতে হয়। সেখানকার শিক্ষা ব্যবস্থাও একদম তলানিতে। কমলার বাড়িতে অভাব সবসময় লেগে থাকত। নুন আনতে পান্তা ফুরানোর সংসারে উচ্চশিক্ষা লাভের আশা করাই যেন বৃথা। তাঁর দিদি বিমলাও স্রেফ অভাবের জন্য অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিল। কিন্তু হাল ছাড়েনি কমলা। এক সাইকেলের ভরসায় দূরদূরান্তে চলে যেতেন পড়াশোনা করার জন্য।

দারিদ্রতা আটকায়নি সফলতাকে

জানা গিয়েছে, কমলা বেসরা দেউলি থেকে এক কিলোমিটার দূরে হেঁটে কেশবপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার প্রথম পাঠ নেন। তারপর ৫ কিলোমিটার দূরে লক্ষ্মণপুর হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেন। পুরুলিয়া নিস্তারিণী কলেজে এরপর ইতিহাসের উপর গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেন। সেখান থেকে সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। শুধু তাই নয় সেখান থেকেই ইউজিসি–র ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি টেস্ট (নেট)–এ জুনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পান কমলা। তাঁর এই সাফল্যে রীতিমত খুশির আবহ তৈরি হয়েছে গোটা গ্রাম জুড়ে।

প্রশংসায় পঞ্চমুখ অধ্যাপকরা

কমলার এই সাফল্যে বেশ খুশি মেদিনীপুরের বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রাক্তন প্রধান নির্মল কুমার মাহাতো। তিনি বলেছেন, ‘পুরুলিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠায় প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে এমন মেধা উঠে আসছে। ওই ছাত্রীর এমন সাফল্য নিঃসন্দেহে বিরাট কৃতিত্ব।’ পাশাপাশি সিধো কানহো বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার গুরুদাস মণ্ডলও বলেন, ‘আমাদের প্রাক্তনীর এই সাফল্য নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য। প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে আসা মেয়েটি সর্বভারতীয় এই পরীক্ষায় নিজের মেধার পরিচয় রেখেছে।’ প্রসঙ্গত, সর্বভারতীয় এই পরীক্ষায় কমলার পার্সেন্টাইল স্কোর হয়েছে ৯৬.৪২। JRF–এর সঙ্গে অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসরের যোগ্যতাও অর্জন করেছেন তিনি। কিন্তু এত কিছুর পরেও কমলার আনন্দ যেন দিকে হয়ে গিয়েছে।

আরও পড়ুন: যাত্রী সংখ্যায় রেকর্ড গড়ল বন্দে ভারত এক্সপ্রেস

জানা গিয়েছে কমলা বেসরার মা গত কয়েকদিন ধরে বেশ অসুস্থ। তাঁকে এইমুহুর্তে বাঁকুড়া সম্মিলনী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে। তাই গত বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে তাঁকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান গৌতম মুখোপাধ্যায় বলেন, “একেবারে প্রান্তিক কৃষক পরিবারের মেয়ে হয়ে স্রেফ প্র্যাকটিস এবং জেদ তাকে এই সাফল্য এনে দিয়েছে। আমরা তাকে কুর্নিশ জানাই।”