শ্রী হনুমান আরতি (Shri Hanuman Aarti in Bengali - "আরতি কীজৈ হনুমান ললা কী, দুষ্ট দলন রঘুনাথ কলা কী") হল সংকটমোচন পরম প্রভু হনুমানজির চরণে নিবেদিত এক অতি মধুর, পুণ্যদায়ী ও পরম অলৌকিক আরাধনা স্তোত্র। বৈদিক সনাতন ঐতিহ্য ও লোক সংস্কৃতিতে বিশ্বাস করা হয়, ভগবান শ্রী হনুমানের আরতি নিবেদন করা মানেই সমস্ত অশুভ শক্তির বিনাশ এবং পরিবারে মাঙ্গলিক কল্যাণ প্রতিষ্ঠা করা। প্রতি মঙ্গলবার ও শনিবার প্রাতঃকালে কিংবা সায়াহ্নে কর্পূর, খাঁটি ঘৃতপ্রদীপ, লাল পুষ্প ও সুগন্ধি ধূপ প্রজ্জ্বলন করে বিশুদ্ধ চিত্তে এই মহিমাময় আরতি গায়ন বা পাঠ করলে গৃহের সমস্ত অশুভ প্রযোগ, বাস্তুদোষ, অলক্ষ্মী ও চরম পারিবারিক অশান্তি নিমিষে দূরীভূত হয়। বিশেষত যাঁদের কোষ্ঠীতে শনিদেবের সাড়ে সাতি, ঢাইয়া বা রাহু-কেতুর অশুভ প্রযোগ রয়েছে, তাঁরা যদি ভক্তিভরে এই আরতি নিবেদন করেন তবে শনিদেবের কোপ থেকে অমোঘ মুক্তি মেলে। ভক্তশিরোমণি হনুমানজির কৃপায় মনের যাবতীয় ভয়, জটিল শারীরিক ব্যাধি ও মানসিক দুশ্চিন্তা বিনষ্ট হয়ে পরিবারে চিরস্থায়ী সুখ-সমৃদ্ধি, প্রখর আত্মশক্তি ও পরম প্রভু শ্রী সীতারাম জীর অপার কৃপাদৃষ্টি বিরাজ করে।
শ্রী হনুমান আরতি- "আরতি কীজৈ হনুমান ললা কী" এর সম্পূর্ণ পাঠ নিচে সুন্দরভাবে তুলে ধরা হলো:
|
আরতি কীজৈ হনুমান ললা কী। দুষ্ট দলন রঘুনাথ কলা কী।। জাকে বল সে গিরিবর কাঁপৈ। রোগ দোষ জাকে নিকট ন ঝাঁকৈ।। |
|
অঞ্জনি পুত্র মহাবলদায়ী। সন্তান কে প্রভু সদা সহাই।। দে বীরা রঘুনাথ পাঠায়ে। লঙ্কা জারী সিয়া সুধ লায়ে।। |
|
লঙ্কা সো কোট সমুদ্র সী খাই। জাত পবনসুত বার ন লাই।। লঙ্কা জারী অসুর সংহারে। সিয়ারামজী কে কাজ সংবারে।। |
|
লক্ষণ মূর্ছিত পড়ে সকারে। আনি সংজীবন প্রাণ উবারে।। পৈঠী পাতাল তোরি জমকারে। অহিরাবণ কী ভুজা উখাড়ে।। |
|
বাঁয়ে ভুজা অসুর দল মারে। ডাহিনে ভুজা সন্তজন তারে।। সুর-নর-মুনি জন আরতি উতারে। জয় জয় জয় হনুমান উচারে।। |
|
কাঞ্চন থার কপূর লৌ ছায়ী। আরতি করত অঞ্জনা মায়ী।। লঙ্কবিধ্বংস কীহ্ন রঘুরায়ী। তুলসীদাস প্রভু কীরতি গায়ী।। |
সিয়াবর রামচংদ্রকী জয় । পবনসুত হনুমানকী জয় । বোলো ভায়ী সব সনাতন কী জয় । 🙏
শ্রী হনুমান আরতির প্রতিটি পংক্তির সহজ ও প্রাঞ্জল বাংলা অর্থ নিচে ছক আকারে বর্ণনা করা হলো:
| ১ | আরতি কীজৈ হনুমান ললা কী।দুষ্ট দলন রঘুনাথ কলা কী।। | ভগবান শ্রীরামের কলা-স্বরূপ এবং দুষ্টদের সংহারকারী শিশু হনুমান জীর আরতি করুন। |
| ২ | জাকে বল সে গিরিবর কাঁপৈ।রোগ দোষ জাকে নিকট ন ঝাঁকৈ।। | যাঁর অপার বল ও পরাক্রমে বিশাল পর্বতও কেঁপে ওঠে এবং যাঁর নিকটে এলে সমস্ত রোগ, দোষ ও নেতিবাচক শক্তি দূরে পালিয়ে যায়। |
| ৩ | অঞ্জনি পুত্র মহাবলদায়ী।সন্তান কে প্রভু সদা সহাই।। | মা অঞ্জনীর পুত্র হনুমান জী অত্যন্ত বলশালী। তিনি তাঁর ভক্ত ও সন্তানদের কষ্টে সর্বদা সাহায্য করেন। |
| ৪ | দে বীরা রঘুনাথ পাঠায়ে।লঙ্কা জারী সিয়া সুধ লায়ে।। | যখন ভগবান শ্রীরাম তাঁকে দায়িত্ব (বীড়া) দিয়ে পাঠিয়েছিলেন, তখন তিনি সমুদ্র পার হয়ে লঙ্কা দহন করেন এবং মা সীতার খোঁজ নিয়ে আসেন। |
| ৫ | লঙ্কা সো কোট সমুদ্র সী খাই।জাত পবনসুত বার ন লাই।। | লঙ্কার মতো শক্তিশালী দুর্গ এবং সমুদ্রের মতো গভীর পরিখা থাকা সত্ত্বেও পবনপুত্র হনুমান জীর সেখানে পৌঁছাতে সামান্যতম বিলম্ব হয়নি। |
| ৬ | লঙ্কা জারী অসুর সংহারে।সিয়ারামজী কে কাজ সংবারে।। | তিনি সমগ্র লঙ্কা ভস্ম করে দেন, দুষ্ট অসুরদের সংহার করেন এবং ভগবান শ্রী সীতারাম জীর সমস্ত কাজ সুসম্পন্ন করেন। |
| ৭ | লক্ষণ মূর্ছিত পড়ে সকারে।আনি সংজীবন প্রাণ উবারে।। | যুদ্ধে লক্ষ্মণ জী মূর্ছিত হয়ে পড়লে হনুমান জী দ্রোণাচল পর্বত থেকে সঞ্জীবনী বুটি নিয়ে এসে তাঁর প্রাণ রক্ষা করেছিলেন। |
| ৮ | পৈঠী পাতাল তোরি জমকারে।অহিরাবণ কী ভুজা উখাড়ে।। | যখন অহিরাবণ রাম-লক্ষ্মণকে পাতাল পুরীতে নিয়ে যায়, তখন হনুমান জী পাতালে প্রবেশ করে যমদূতদের পরাজিত করেন এবং অহিরাবণকে বধ করেন। |
| ৯ | বাঁয়ে ভুজা অসুর দল মারে।ডাহিনে ভুজা সন্তজন তারে।। | হনুমান জী তাঁর বাম বাহু দিয়ে দুষ্ট অসুর দলকে বিনাশ করেন এবং দক্ষিণ বাহু দিয়ে সাধু ও ভক্তদের উদ্ধার করেন। |
| ১০ | সুর-নর-মুনি জন আরতি উতারে।জয় জয় জয় হনুমান উচারে।। | দেবতা, মানব এবং মুনিগণ সকলে মিলে হনুমান জীর আরতি করেন এবং 'জয় জয় জয় হনুমান' ধ্বনি দেন। |
| ১১ | কাঞ্চন থার কপূর লৌ ছায়ী।আরতি করত অঞ্জনা মায়ী।। | সোনার থালে কর্পূরের উজ্জ্বল প্রদীপ জ্বালিয়ে স্বয়ং মা অঞ্জনা তাঁর মহান পুত্র হনুমান জীর আরতি করছেন। |
| ১২ | লঙ্কবিধ্বংস কীহ্ন রঘুরায়ী।তুলসীদাস প্রভু কীরতি গায়ী।। | ভগবান শ্রীরামের কৃপায় হনুমান জী লঙ্কা ধ্বংস করেছিলেন। গোস্বামী তুলসীদাস জী প্রভু হনুমান জীর এই মহিমা গান করেন। |
| ১৩ | জো হনুমানজী কী আরতি গাবৈ।বসী বৈকুণ্ঠ পরমপদ পাবৈ।। | যিনি ভক্তিভরে হনুমান জীর এই আরতি গান করেন, তিনি বৈকুণ্ঠ ধামে বাস করেন এবং পরমপদ (মুক্তি) লাভ করেন। |
সনাতন হিন্দু ধর্মে শ্রী হনুমান আরতি (আরতি কীজৈ হনুমান ললা কী) হলো ভারতের প্রতি গৃহে ও মন্দিরে গীত হওয়া পরম পবিত্র প্রাত্যহিক আরাধনা সঙ্গীত। বৈদিক ঐতিহ্য অনুযায়ী, গোস্বামী তুলসীদাস এবং পরবর্তী যুগের মহান রামভক্ত সাধকগণ পবনপুত্র হনুমানজির অসীম বীরত্ব, আনুগত্য ও ভক্তবৎসল রূপের স্মরণে এই অপূর্ব আরতি রচনা করেছিলেন। 'আরতি' শব্দের অর্থ হলো সমস্ত অশুভ দূর করে শুভ আলোকে ভগবানকে আবাহন করা।
এই আরতির প্রতিটি পংক্তিতে রামায়ণের অতি অলৌকিক ঘটনাপ্রবাহ সুরের ছন্দে ফুটে উঠেছে। মহাবীর হনুমানজির শৌর্যগাথা-যেমন সমুদ্র অতিক্রম করে লঙ্কা দহন করা, অশোক কাননে মাতা সীতার অন্বেষণ করা, যুদ্ধক্ষেত্রে মহাবীর লক্ষ্মণ মূর্ছিত হলে দ্রোণগিরি পর্বত কাঁধে তুলে নিয়ে সঞ্জীবনী বুটি নিয়ে আসা, এবং পাতালে রাবণের ভাই অহিরাবণকে বধ করে প্রভু রাম-লক্ষ্মণকে উদ্ধার করার ইতিহাস পরম ভক্তিতে স্মরণ করা হয়। হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী, যে ঘরে নিয়ম করে কপূর ও ঘৃতপ্রদীপ জ্বেলে হনুমান আরতি গীত হয়, সেখানে কোনো অশুভ শক্তি, দারিদ্র্য বা কুপরামর্শ প্রবেশ করতে পারে না।
শ্রী হনুমানজির আরতি নিবেদন করার পরম শুভ সময় ও সঠিক বৈদিক নিয়মাবলী নিচে বিস্তারিত উল্লেখ করা হলো:
নিয়মিত শ্রদ্ধার সাথে শ্রী হনুমান আরতি গাইবার ও শ্রবণ করার প্রধান অলৌকিক সুফলগুলি নিম্নরূপ: