অনন্যা সরকার, লাদাখ: মাউন্ট এভারেস্টের (Mount Everest) বরফাবৃত চূড়ায় ৮,০০০ মিটার উঁচু ‘ডেথ জোন’-এ তিন দশক ধরে এক পর্বতারোহী (Mountaineer) অপেক্ষায় রয়েছেন কবে তাঁকে নীচে নামিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। না জীবিত অবস্থায় নয়, সবুজ বুট পরা সেই ব্যক্তির শব একইভাবে একই জায়গায় পড়ে রয়েছে আজ ৩০ বছর। তাকে নামিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। পরিচিতি হারিয়ে গিয়েছিল, তবে পায়ের সবুজ বুট গুলির জন্য বিশ্ব তাঁকে ‘গ্রিন বুটস’ (Green Boots) নামে চেনে। এতদিন ধারণা করা হচ্ছিল মরদেহটি আইটিবিপি (ITBP) হেড কনস্টেবল শেওয়াং পালজোরের, কিন্তু সম্প্রতি ডিএনএ টেস্টে নিশ্চিত হয়েছে যে, এটি ল্যান্স নায়েক দোর্জে মোরুপের দেহ। এতগুলো বছর পর অক্টোবর মাসের মধ্যেই তাঁর দেহটি নামিয়ে আনা সম্ভব হবে। শেষ দেখা দেখতে অপেক্ষায় দিন গুনছেন লাদাখে তাঁর পরিবার পরিজনেরা।
কী ঘটেছিল ৩০ বছর আগে?
১৯৯৬ সালে দোর্জে মোরুপ, শেওয়াং পালজোর এবং সুবেদার শেওয়াং সামানলা তিনজনে মিলে তিব্বত থেকে উত্তর পথ ধরে এভারেস্টের উদ্দেশ্যে পাড়ি দেন। তাঁরা ছিলেন বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ জয় করা প্রথম তিন সদস্যের ভারতীয় দল। সেবছর ১০ই মে, চূড়ার কাছাকাছি এক ভয়াবহ তুষারঝড়ে তাঁরা তিনজনেই আটকে পড়েন। সেই মরশুমে মোট ১২ জন পর্বতারোহী মৃত্যু হয়, তার মধ্যে ছিলেন এই তিন এভারেস্ট জয়ীও।
ল্যান্স নায়েক দোর্জে মোরুপের বাড়িতে রয়েছেন তাঁর ৭৫ বছর বয়সী স্ত্রী কঞ্চোক ইয়াংস্কিট এবং ছেলে ফুন্টসোগ দোর্জে। বয়সের ভারে ন্যুব্জ কঞ্চোক কানে শুনতে পাননা, স্বামীর পেনশনের ওপর নির্ভর করে বেঁচে রয়েছেন। দোর্জের ছেলে যখন তাঁকে বাবার মরদেহ উদ্ধারের কথা জানান, তখন থেকে কেঁদেই চলেছেন বৃদ্ধা। ছেলেকে লিখে জানিয়েছিলেন তার শেষ ইচ্ছের কথা। বলেছিলেন “তাকে একবার দেখার পরে আমি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করবো”। দোর্জের ছেলে ফুন্টসোগ বাবার মতোই ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছেন। তিনি জানান, আইটিবিপি এই উদ্ধার অভিযান সম্পর্কে সম্পূর্ণ তথ্য তাঁকে এখনও দেয়নি। সারা জীবন তার মাকে বাবার জন্য অপেক্ষা করে চোখের জল ফেলতে দেখেছেন। আজ তাঁর দুচোখে আসার আলো দেখা যাচ্ছে।
আরও পড়ুন: নিমেষেই উধাও হবে ব্রণ! মাত্র ৪৭ টাকায় ফেসওয়াশ দিচ্ছে কেন্দ্র, কোথায় পাবেন?
কীভাবে সামনে এলেন ‘গ্রিন বুটস’?
ব্রিটিশ পর্বতারোহী ও চলচ্চিত্র নির্মাতা ম্যাট ডিকিনসন ১৯৯৬ সালে সর্বপ্রথম বরফে আটকে থাকা দোর্জে মোরুপের দেহের একটি ভিডিও রেকর্ড করেছিলেন। এই ফুটেজটি পরে ‘সামিট ফিভার’ নামে একটি তথ্যচিত্রে দেখানো হয়। তার পরা সবুজ বুটের কারণে দেহটিকে সবাই ‘গ্রিন বুটস’ বলে ডাকতে শুরু করে। এভারেস্টের উত্তর পথের একটি ছোট গুহায় দেহটি দেখতে পাওয়া গিয়েছিল, যা ‘গ্রিন বুটস কেভ’ নামেই লোকমুখে পরিচিত হয়ে যায়। এভারেস্টের যাওয়ায় সময় প্রায় সকল পর্বতারোহীই এই পথ দিয়ে যান এবং এই গুহা তাদের কাছে এখন একটি ল্যান্ডমার্ক হয়ে গিয়েছে।
আরও পড়ুন: প্রাকৃতিক ও জীব বৈচিত্র্যে ভরপুর সেঁওয়াতি, পুরুলিয়ায় গড়ে উঠবে নতুন পর্যটন কেন্দ্র
দোর্জের মোরুপার দেহটি ৮,০০০ মিটার বা প্রায় ২৬,২৪৭ ফুটের ওপরে অবস্থিত ‘ডেথ জোন’-এ পাওয়া যায়। এই অঞ্চলের অক্সিজেনের মাত্রা সমুদ্রপৃষ্ঠের তুলনায় ৩৩% কম। এমনকি, হেলিকপ্টারও এখানে পৌঁছাতে পারে না। তাই এখান থেকে মৃতদেহ উদ্ধার করা বিশ্বের অন্যতম কঠিন অভিযান হিসেবে বিবেচিত হবে। একারণেই এভারেস্ট যাত্রাপথে নিহত ৩৪০ জনেরও বেশি পর্বতারোহীর অধিকাংশের মৃতদেহ আজও মর্মান্তিকভাবে সেখানেই পড়ে রয়েছে।










