বদলাবে বিশ্বের ৪৫০ বছর পুরনো নকশা, বাড়বে আফ্রিকা, ছোট দেখাবে ইউরোপ-আমেরিকাকে

Published:

Equal Earth Projection World Map

অনন্যা সরকার, কলকাতা: বদলে যাবে বিশ্ব মানচিত্র (World Map)। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ (United Nations General Assembly) একটি নতুন বিশ্ব মানচিত্রের নকশা অনুমোদন করেছে, যা একে অপরের সাপেক্ষে মহাদেশগুলোর আকার আরও নির্ভুলভাবে তুলে ধরেছে। এই মানচিত্রে আফ্রিকাকে আরও বড় দেখাবে, অন্যদিকে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা হবে ছোট। এই প্রস্তাবের সপক্ষে ১৬৪টি দেশ ভোট দিয়েছে, ৬টি দেশ ভোটদান করেনি এবং একমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই এর বিরোধিতা করে।

এবার মানচিত্রে আফ্রিকা মহাদেশকে দেখা যাবে তার আসল পরিধির সাথে

নতুন এই মানচিত্রটির নাম দেওয়া হয়েছে  ‘ইকুয়াল আর্থ’। এর উদ্দেশ্যে হল যতটা সম্ভব নির্ভুলভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অংশের প্রকৃত আকার প্রদর্শিত করা। পুরোনো ‘মার্কেটর মানচিত্রটি’ বদলে এটি ব্যবহারের জন্য আহ্বান জানানো হচ্ছে দেশগুলোকে। কিন্তু এখন প্রশ্ন হল পুরনো মানচিত্রটিতে কেন প্রকৃত আকারে তুলনায় ছোট দেখাতো আফ্রিকাকে? এটা বুঝতে গেলে প্রথমে মার্কেটর প্রজেকশন (Mercator Projection) সর্ম্পকে জানতে হবে। ধরুন আপনি হাতে একটি কমলালেবু ধরে আছেন। কমলালেবু আমাদের এই পৃথিবীর মতোই গোলাকার। এবার, যদি আপনি এর খোসা ছাড়িয়ে একটি টেবিলের ওপর সমানভাবে বিছিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন, তবে এর ধারগুলো ছিঁড়ে যাবে, অথবা খোসাটিকে জোর করে টানতে হবে। একটি গোলাকার পৃথিবীকে একটি বর্গাকার কাগজে আঁকার চেষ্টা করার সময়ও একই সমস্যা দেখা দিয়েছিল।

আজ থেকে প্রায় ৪৫০ বছর, ১৫৬৯ সালে জেরার্ডাস মারকেটর এই একই মানচিত্রটি তৈরি করেন। সেই সময়ে বিমানের অস্তিত্ব ছিল না এবং দূর দূরান্তে যাওয়ার জন্য মানুষকে জাহাজে করে মাসের পর মাস ভ্রমণ করতে হত। নাবিকরা যাতে সমুদ্রে হারিয়ে না যায়, সেজন্য মারকেটর একেবারে সহজ রেখা দিয়ে পথ ও দিকনির্দেশনা আঁকেন, যা জাহাজগুলোকে সঠিক দিশা খুঁজে পেতে সাহায্য করতো।

আরও পড়ুন: এ যেন রাঘববোয়াল! মৎস্যজীবীর জালে ধরা পড়ল পেল্লাই সাইজের ইলিশ, দাম কত জানেন?

তবে, দিকগুলো সোজা রাখার চেষ্টা করতে গিয়ে তিনি একটি বড় ভুল করে ফেলেছিলেন। কাগজের ওপর গোলাকার পৃথিবী আঁকার ফলে এর উপরের দিকে একটি বড়, তির্যক কোণ তৈরি হয়। যার ফলে বিশ্বের শীতল অঞ্চলগুলো তাদের প্রকৃত আকারের চেয়ে বড় দেখাতে শুরু করে।  গ্রিনল্যান্ডকে, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা আসল আকারের চেয়ে অনেক বড় দেখাত, আর নিরক্ষীয় অঞ্চলের কাছে অবস্থিত আফ্রিকা ও ভারতের মতো বিশাল ভূখণ্ডগুলো আকারে ছোট হয়ে যায়। বাস্তবে, আফ্রিকা আয়তনে গ্রিনল্যান্ডের চেয়ে ১৪ গুণ বড়, কিন্তু মার্কেটর মানচিত্রে দুটিকে প্রায় সমান দেখায়। তাই সমুদ্রে দিকনির্দেশনার ক্ষেত্রে এই মানচিত্র ব্যাপকভাবে সাহায্য করলেও, দেশগুলির প্রকৃত আকার দেখাতে ব্যর্থ হয়। 

কী পরিবর্তন আসতে চলেছে নতুন মানচিত্রে?

‘ইকুয়াল আর্থ’ প্রজেকশনটি ২০১৮ সালে মানচিত্রকাররা (Cartographer) তৈরি করেন। এর মাধ্যমে পৃথিবীর মহাদেশগুলোকে তাদের প্রকৃত আয়তনের আরও কাছাকাছি করে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা, দক্ষিণ এশিয়া এবং ওশেনিয়া আগের চেয়ে বড় দেখায় এই ম্যাপে। আর ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকা হয়েছে ছোট। এই মানচিত্রটি দৃশ্যত পরিবর্তিত হওয়ার পাশাপাশি পৃথিবীর আকার সম্পর্কে মানুষকে আরও সঠিক ধারণা দেবে।

আরও পড়ুন: গঙ্গা জলবণ্টন চুক্তি নিয়ে বিহার সরকারের আপত্তি, বাংলাদেশকে ঝটকা দিতে পারে ভারত

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ১৬৪টি দেশ নতুন মানচিত্রের প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দেয়। একমাত্র বিরোধিতা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। আর ছ’টি দেশ ভোটদান করেনি। প্রস্তাবটি উত্থাপন করেছিলেন টোগোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট দুসি। তিনি বলেন, যদি মানচিত্রে কোনও অঞ্চলকে তার প্রকৃত আকারের চেয়ে আলাদা দেখায়, তাহলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই ভুল ধারণাই থেকে যাবে। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ প্রস্তাবটি অনুমোদন করেছে। সদস্য দেশগুলোকে এখন প্রচলিত মারকেটর প্রজেকশনের পরিবর্তে “ইকুয়াল আর্থ” মানচিত্র ব্যবহার করার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বিশ্বের দেশগুলোর প্রকৃত আয়তন বুঝতে পারে।