অনন্যা সরকার, রাজস্থান: দৃঢ় সংকল্প ও কঠোর পরিশ্রমের সাহায্যে যে সব বাধা বিপত্তিকে জয় করা যায়, তারই প্রমাণ দিলেন রাজস্থানের সিকর জেলার সুনীল লোহার (NEET UG 2026 Success Story of Sunil Lohar)। গাদিয়া লোহার সম্প্রদায়ভুক্ত অতি সাধারণ পরিবার, একসময় বাবার সাথে বাড়ি বাড়ি ঘুরে পুরোনো, ভাঙাচোরা সামগ্রী সংগ্রহের (Scrap Collector) কাজ করতেন। সেই সুনীলই এবছর নিট (NEET UG 2026) পরীক্ষায় ওবিসি (OBC) বিভাগে সর্বভারতীয় স্তরে ৫,৬৮০তম স্থান অর্জন করে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্নের দিকে একধাপ এগিয়ে গিয়েছেন। তাঁর এই সাফল্য আজ তাঁর পরিবার ও সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে গর্বের কারণ হয়ে উঠেছে।
সন্তানকে হারানোর যন্ত্রনাকে বুকে করে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্নপূরণ
রাজস্থানে সিকর জেলার রিঙ্গুসের ১২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা সুনীল লোহারের এই সাফল্য আরও বেশি অনুপ্রেরণাদায়ক হয়ে উঠেছে কারণ মাত্র কয়েক মাস আগেই তিনি তাঁর ছোট্ট ছয় মাসের শিশুপুত্রকে হারিয়েছেন। ওই চরম মানসিক বিপর্যয় সত্ত্বেও সুনীল তাঁর লক্ষ্যের প্রতি অবিচল ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, ডাক্তার হতে পারলে অসংখ্য দরিদ্র মানুষের সেবা করতে পারবেন তিনি। তিনি যে কষ্ট সহ্য করছেন, সেই কষ্ট যেন আর কাউকে পেতে না হয়।
আরও পড়ুন: বাড়ি বাড়ি করতেন রঙয়ের কাজ, এবার হবেন ডাক্তার! NEET-এ অভাবনীয় সাফল্য সুরজের
মোবাইল ফোন সেভাবে ব্যবহারই করতেন না সুনীল। যেটুকু সময় পেতেন পুরোটাই নিট (NEET) পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য ব্যয় করতেন। পাশাপাশি সুযোগ পেলেই বাবাকে পারিবারিক কাজে সাহায্যও করতেন। তিনি জানান যে, নিটের প্রস্তুতির আগে তিনি প্রায়শই তাঁর বাবার সাথে বাড়ি বাড়ি পুরোনো সামগ্রী সংগ্রহ করতে যেতেন।
সুনীলের স্ত্রী ইন্দ্রা দেবী জানান, প্রায় সাত মাস আগে গুরুতর অসুস্থতার কারণে তাঁদের ছয় মাস বয়সী শিশুপুত্রটিকে হারাতে হয়েছে। সেই শোকের সময়ে পরিবারের সদস্যরা চেয়েছিলেন সুনীল বাড়িতেই থাকুক, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, সে তার নিটের প্রস্তুতি চালিয়ে যাবে। এমনকি, পড়াশোনা পুনরায় শুরুর আগে সুনীল মাত্র একদিনের জন্য বাড়ি ফিরেছিল। তিনি জানান, সন্তান হারানোর শোক কি আর এত সহজ মন থেকে মুছে ফেলা যায়। তবে সুনীলের এই সাফল্য তাঁর পরিবারের মানুষগুলির মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
আরও পড়ুন: দিনে টোটো চালিয়ে রাতে পড়াশোনা, NEET-এ অভাবনীয় সাফল্য যুবকের
সুনীলের বাবা ভগবান সহায় লোহার জানান, তাঁদের সম্প্রদায়ের মানুষরা সাধারণত অল্প বয়স থেকেই কামারের কাজ বা লোহার কাজ করা শুরু করে দেয়। সেখানে পড়াশোনাকে সেভাবে গুরুত্বই দেওয়া হয় না। তাই তিনি গর্ব প্রকাশ করেন যে, তাঁর ছেলের শিক্ষার প্রতি অনুরাগ এবং পড়াশোনা করে সফল হওয়ার অঙ্গীকার তাদের সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের এই মানসিকতাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। তাঁর বিশ্বাস সুনীলের এই সাফল্য তাদের গাদিয়া লোহার সম্প্রদায়ের আরও অনেক পরিবারকে তাদের সন্তানদের শিক্ষিত করে তুলতে এবং পড়াশোনাকে ভিত্তি করে জীবনে উন্নতি করার আকাঙ্ক্ষাকে জাগিয়ে তুলতে অনুপ্রাণিত করবে।
সুনীলের মা সিক্রি দেবী বলেন, এই সাফল্য কেবল পরিবারের জন্যই নয়, বরং পুরো সম্প্রদায়ের জন্যই গর্বের কারণ হয়ে উঠেছে। তাঁর পরিবার আশা করছে যে, সুনীলের এই কঠিন যাত্রা তাঁর মতো অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা আরও অনেক ছেলেমেয়েকে জীবনে বাধাবিপত্তি পেরিয়ে এগিয়ে চলার জন্য উদ্বুদ্ধ করবে।










