দিনমজুর বাবা, চরম দারিদ্রের মধ্যেও NEET ক্র্যাক করে নজির গড়ল পাঁচ ভাইবোন

Published:

NEET UG Success Story of Odisha Siblings

অনন্যা সরকার, ওড়িশা: অধ্যাবসায় ও কঠোর পরিশ্রমের জোরে অসাধ্য সাধন করা যায়। অভাব-অনটন, বাধা, প্রতিকূলতা পেরিয়ে পৌঁছানো যায় সাফল্যের শিখরে। এটাই প্রমাণ করে দেখালেন ওড়িশার কান্ধামাল জেলার একটি প্রত্যন্ত গ্রামের পাঁচ ভাইবোন (NEET UG Success Story of Odisha Siblings)। দিনমজুরি ও কৃষিকাজ করে সংসার চালানো এক ব্যক্তির চার সন্তান ও এক ভাইঝি নিট (NEET) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সরকারি মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস (MBBS) পড়ার সুযোগ পেয়েছে। তাদের এই সাফল্যের কাহিনীটি এখন দেশের অজস্র ছাত্রছাত্রীদের অনুপ্রেরণা যোগাচ্ছে, বিশেষত যারা প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও পড়াশোনা করে এগিয়ে যেতে চান, তাদের কাছে একটি দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। 

চরম প্রতিকূলতার মধ্যে পড়াশোনা করে নিট ক্র্যাক

ওড়িশার কান্ধামাল জেলার দারিংবাড়ি ব্লকের এক প্রত্যন্ত গ্রামের জরাজীর্ণ বাড়িতে দিনমজুর বুর্সি এবং অনুসূয়া প্রধানের সংসার। তবে, দারিদ্র্যের সাথে লড়াই করে এই পরিবারেই পাঁচ সদস্য এখন তাঁদের স্বপ্নপূরণের দিকে দৃপ্ত পদে এগিয়ে চলেছেন। এই দম্পতির চার সন্তান এবং এক ভাইঝি বর্তমানে ওড়িশার বিভিন্ন মেডিকেল কলেজে ডাক্তারি পড়ছে। তাঁদের বড় ছেলে বিভীষণ প্রধান ২০২১ সালে কোরাপুট-এর শ্রী লক্ষ্মণ নায়ক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ভর্তি হন। গত বছর মেয়ে মোনালিসা একই প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়েছে। এবছর ছেলে আসারিয়া ভবানীপত্তনার শহীদ রিন্দো মাঝি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল এবং মেয়ে সুনেমি বালেঙ্গিরের ভীমা ভই মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি হয়েছে।

এর পাশাপাশি, পরিবারের সাফল্যের এই ধারায় আরও একটি সংযোজন হল তাদের ভাইজি মিনাক্ষী প্রধানের সাফল্য। একই পরিবারের সদস্য ও বুরসির ছোট ভাইয়ের মেয়ে মিনাক্ষীও এবছর ‘নিট’ (NEET) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে পুরীর শ্রী জগন্নাথ মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হসপিটালে এমবিবিএস পড়ার সুযোগ পেয়েছে।

আরও পড়ুন: ফুটপাতে ব্যাগ বিক্রি করেন বাবা, চরম দারিদ্র্যের মধ্যেও একসাথে NEET, JEE ও CUET ক্র্যাক ছেলের

সাত সন্তানের পিতা বুর্সি, তাঁর পরিবারের ভরণপোষণ করতে এবং সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগাতে বহু বছর ধরে দিনমজুর হিসেবে কাজ করেছেন, কিছুদিন কেরালাতেও ছিলেন। অবশেষে অসুস্থতার তাঁকে বাড়ি ফিরে আসতে হয়। বর্তমানে পরিবারটি সীমিত অর্থে অতিকষ্টে দিন কাটাচ্ছেন।

এই পরিবারের এতজন সন্তানের পক্ষে মেডিকেল কলেজ অবধি পৌঁছনোর পথটা মোটেও সহজ ছিল না। গতবছর মেডিকেলে সুযোগ পাওয়া মোনালিসা নিট (NEET)-এর প্রস্তুতি নেওয়ার পাশাপাশি তাঁর বড় ভাইয়ের পড়াশোনায় সাহায্য করার সময় বেরহামপুরের একটি কাপড়ের দোকানে কাজ করতেন। তাঁর এই প্রচেষ্টা সাফল্য লাভ করে, যখন তিনি গত বছর বেরহামপুরের এমকেসিজি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের একজন ডাক্তারের আর্থিক সহায়তায় একটি আসন লাভ করেন।

আরও পড়ুন: উপহাস করত গ্রামবাসী, কোচিং ছাড়া UPSC ক্র্যাক করে সবথেকে কম বয়সী IAS কৃষকের মেয়ে

বড় দাদা দিদির দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে আসারিয়া ও সুনেমি দ্বাদশ শ্রেণির পড়াশোনা শেষ করার পর নিট (NEET)-এর জন্য প্রস্তুতি শুরু করে। তারা বেরহামপুরেই একটি ছোট বাড়ি ভাড়া নিয়ে একসঙ্গে পড়াশোনা করত। আশ্চর্যজনকভাবে, দুজনেই কোনও কোচিংয়ের সাহায্য ছাড়াই এই অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। প্রথম চেষ্টাতেই নিট (NEET) পাশ করা আসারিয়া জানিয়েছে, প্রস্তুতির পুরোটা সময় জুড়ে সে তার বড় ভাই ও বোনের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছে এবং তারাই তাকে এগিয়ে যাওয়ার সাহস যুগিয়েছে। 

সারা পরিবার এখন আনন্দের আবহ থাকলেও অর্থনৈতিক দুশ্চিন্তা রয়েই গেছে। কৃষি জমিতে শ্রমিকের কাজ করেন ওই চার কৃতি শিক্ষার্থীর মা অনুসূয়া প্রধান জানান, তাঁর চার সন্তান ও এক ভাইঝি ডাক্তারি পড়ছে বলে তিনি অত্যন্ত খুশি, কিন্তু আগামী দিনগুলিতে তাদের পড়াশোনার খরচ কীভাবে সামলাবেন, তা ভেবে কুলকিনারা পাচ্ছেন না। এবছর কলেজে ভর্তির খরচ মেটাতে পরিবারের কাঁধে চেপেছে ঋণের বোঝা। তবে কিছুটা আশার আলোও দেখা যাচ্ছে। বর্তমানে ইন্টার্নশিপ শেষ করতে চলা বিভীষণ, খুব শীঘ্রই ছোট ভাইবোনদের পড়াশোনায় সাহায্য করার পাশাপাশি পরিবারের ঋণ শোধেও সহায়তা করতে সক্ষম হবেন।