অনন্যা সরকার, ওড়িশা: শূন্য থেকে শুরু করে কীভাবে বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলা যায়, তা হাতেকলমে করে দেখিয়েছেন ওড়িশার কৃষক সন্তোষ সাহু (Success Story of Lemon Cultivator Santosh Sahu)। তিনি দেশি লেবু চাষের মাধ্যমে কৃষি সংকটের মোকাবিলা করে সেটিকে একটি সফল ব্যবসায়িক উদ্যোগে রূপান্তর করেছেন। তাঁর নিজের গ্রাম ওগিতে হাতি ও বাঁদরের উৎপাতে প্রচলিত ফসল প্রায়শই নষ্ট হয়ে যেত। এর ফলে স্থানীয় কৃষকরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতেন। এই সংকট থেকে উত্তরণের উপায় খুঁজতে গিয়ে সন্তোষ সাহু লেবু জাতীয় গাছ লাগানোর সিদ্ধান্ত নেন, কারণ বন্য প্রাণীরা সাধারণত এই গাছগুলো এড়িয়ে চলে। তাঁর এই কৌশলগত পরিবর্তনের ফলে বর্তমানে বছরে ১ কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে এবং তাঁর এই উদ্যোগে গ্রামের শত শত পরিবার যুক্ত হয়েছে। আসুন সন্তোষ সাহুর এই সাফল্যের কাহিনীটি জেনে নেওয়া যাক।
বন্যপ্রাণীর হাত থেকে বাঁচতে বিকল্প চাষের পদ্ধতি
পুরো ওড়িশা জুড়ে কৃষিজমিতে বন্য হাতির ঘন ঘন আক্রমণ কৃষকদের কাছে একটি বড় সমস্যা হয়ে উঠেছে। অনেক সময় কৃষকরা তাঁদের উৎপাদিত ফসল কম দামে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন, এমনকি লোকসানের জন্য চাষাবাদ ছেড়েও দেন অনেকে। এই সমস্যাগুলি পর্যবেক্ষণ করে সন্তোষ সাহু সিদ্ধান্ত নেন এমন ফসল চাষ করবেন, যেগুলি বন্য প্রাণীরা সাধারণত এড়িয়ে চলে। এই ভাবনা থেকেই শুরু করেন কাগজি লেবুর চাষ, যার মাধ্যমে বন্য প্রাণীর দ্বারা ফসল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমছে।
তিনি প্রথমে এক একর জমিতে লেবু গাছ লাগানো শুরু করেন এবং দ্রুত দেখতে পান যে গাছগুলোর বেঁচে থাকার হার অনেক বেশি এবং ফলনও চমৎকার হয়। সন্তোষ সাহুর রোপণ করা পূর্ণবয়স্ক গাছগুলো এখন ১২ ফুট পর্যন্ত লম্বা এবং এমন উন্নত মানের ফল দেয়, যা বাজারে ভালো দামে বিক্রি হয়।
আরও পড়ুন: রাজ্যে ফের চালু হবে বন্ধ প্রাথমিক স্কুল, বড় ঘোষণা স্কুল শিক্ষামন্ত্রীর
বাজারের সম্ভাবনা বুঝতে পেরে সন্তোষবাবু নিজের উৎপাদনের বাইরে গিয়ে ব্যবসার পরিধি বাড়াতে শুরু করেন। তিনি বর্তমানে ওগির অন্যান্য কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি লেবু কেনেন এবং প্রতি ১০০টি লেবুর জন্য তাঁদের ২২০ থেকে ২৮০ টাকা দেন। এরপর সেগুলো বড় শহরের ক্রেতাদের কাছে ৩০০ থেকে ৩২০ টাকায় বিক্রি করেন। তাঁর এই ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক কৃষকদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করে, তাঁর মোট আয়ের প্রায় ৬০ শতাংশই স্থানীয় কৃষকদের কাছে ফিরে যায়। বর্তমানে এই অঞ্চলের প্রায় ৫০০টি পরিবার লেবু চাষের ওপর নির্ভর করে স্থিতিশীলভাবে উপার্জন করতে পারছেন।
লেবু সংগ্রহের দুটি প্রধান মরশুম – জুন থেকে আগস্ট এবং নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি। এই সময় স্থানীয় কৃষিজীবীরা গাছ থেকে লেবু পেড়ে সেগুলো সংরক্ষণ করেন। শীতকালে প্রতিটি লেবুর ওজন ৬০ গ্রাম পর্যন্ত হতে পারে এবং খোলা বাজারে প্রতিটি লেবু ৩ থেকে ৩.২০ টাকায় বিক্রি হয়। এর থেকে একজন কৃষক ২৫,০০০ থেকে ৩০,০০০ টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারেন।
ওড়িশার ওগির এই লেবু এখন কটক, ভুবনেশ্বর এবং জামশেদপুরে সরবরাহ করা হচ্ছে। সম্প্রতি এগুলো যুক্তরাজ্য ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও সফলভাবে রপ্তানি করা হয়েছে। এই অঞ্চলের লেবু চাষিরা জানাচ্ছেন, ফসলের ফলন বজায় রাখার জন্য প্রতিদিন ১১ লিটার পর্যন্ত জলের প্রয়োজন হয়, পাশাপাশি গাছের গোড়ায় নিয়মিত জৈব সার প্রয়োগ করতে হয়। সুপরিকল্পিত উদ্যোগ ও স্থানীয় মানুষদের সহযোগিতার মাধ্যমে সন্তোষ সাহু এমন একটি লাভজনক কৃষি মডেল গড়ে তুলেছেন, যা কেবল বন্য প্রাণীর হাত থেকে বাঁচিয়েছে তাই নয়, এর পাশাপাশি বিশ্ববাজারেও সাফল্য অর্জন করেছে।










