অনন্যা সরকার, কলকাতা: কথায় বলে যত বড় প্রতিকূলতাই হোক না কেন, সন্তানের জন্য মায়ের অটল সংকল্পের কাছে সকল বাধাই মাথা নত করে দাঁড়ায়। মহারাষ্ট্রের একটি ছোট শহর থেকে উঠে আসা বরুণ বারানওয়াল (UPSC Success Story of IAS Varun Baranwal) কঠিন পরিশ্রম এবং তাঁর মায়ের আত্মত্যাগই হল এর জলজ্যান্ত উদাহরণ। বাবার মৃত্যুর পর পাংচার সারাইয়ের দোকান চালিয়ে সংসার ও সন্তানের পড়াশোনার খরচ যোগান মা। আজ সেই বরুণ বারানওয়ালের সাফল্যের কাহিনীটি দেশের সেই সমস্ত ছেলেমেয়েদের অনুপ্রাণিত করে, যারা নিত্যদিন প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জনের চেষ্টা করে যাচ্ছেন। আসুন তাঁর এই সাফল্যের গল্পটি জেনে নেওয়া যাক।
বাবার আকস্মিক মৃত্যুর পর চরম জীবন সংগ্রাম শুরু
মহারাষ্ট্রের পালঘর জেলার বোইসার নামের এক ছোট শহরের বাসিন্দা বরুণ বারানওয়াল। অভাব অনটনের সংসারে ছোটখাটো জিনিসের জন্যও তাঁদের অনেক সংগ্রাম করতে হত। বরুণের বাবার একটি সাইকেলের পাংচার সারানোর দোকান ছিল, সেখান থেকেই যা আয় হতো তা দিয়ে অনেক কষ্টে সংসার চালাতেন। তবুও তিনি সবসময় খেয়াল রাখতেন যাতে ছেলের পড়াশোনায় কোনো ব্যাঘাত না ঘটে। বরুণ ছোটবেলা থেকেই খুবই মেধাবী ছাত্র ছিলেন। কিন্তু ২০০৬ সালে দশম শ্রেণির পরীক্ষা শেষ হওয়ার মাত্র তিন দিন পর ১৬ বছরের বরুণের জীবনে নেমে এল ভয়ঙ্কর দুর্যোগ। দীর্ঘ অসুস্থতার পর তার বাবা মারা গেলেন, যিনি ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী।
আরও পড়ুন: বদ্ধ ঘরেই জাফরানের চাষ করে তাক লাগলেন ভাই-বোনের জুটি, মাসে আয় ১৮ লক্ষ
বরুণ দশম শ্রেণিতে প্রথম হন, সবাইকে আনন্দ করে জানাতে চেয়েছিলেন সেই কথা, কিন্তু তখনই তাঁর দিকে ছুটে আসে প্রশ্নবাণ, “এখন কী করবে?”। তার পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে যায়। ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখা বরুণকে পাড়া-প্রতিবেশী আত্মীয়স্বজনরা পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার পরামর্শ দেয়। তাঁকে সবাই বলে মা ও ভাইবোনদের ভরণপোষণের জন্য বাবার পাংচার সারাইয়ের দোকানটির দায়িত্ব নিতে। সেইসময় বরুণ সবার কথা শুনে বইপত্র দূরে সরিয়ে সাইকেলের পাংচার সারানোর সরঞ্জাম হাতে তুলে নেন।
স্কুলে না গিয়ে সংসারের খরচ জোগাতে বরুণ প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই দোকানে চলে যেতেন। তাঁর উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন তখন বাস্তবের মাটি থেকে অনেক দূরে। ছেলের কষ্ট আর সহ্য করতে পারলেন না মা। তিনি সংকল্প করেন, তাঁর যতই কষ্ট হোক না কেন, ছেলেকে তিনি পড়াবেনই। বরুণকে লেখাপড়া করতে বলে, নিজে যেতে শুরু করেন পাংচার সারাইয়ের দোকানে। সন্তানদের পড়াশোনার পাশাপাশি পুরো সংসারের দায়িত্বও নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন মা। আর দোকান থেকে ১০০ টাকা আয় করলে, তিনি ৫০ টাকা সংসারের খরচে ব্যয় করে বাকি ৫০ টাকা সন্তানদের পড়াশোনার জন্য সঞ্চয় করতেন।
আরও পড়ুন: পরিচিতরা বলেছিল দিনমজুর হতে, বাস ড্রাইভারের ছেলে UPSC ক্র্যাক করে আজ IAS
স্কুল শেষ করে বরুণ ডাক্তারি পড়তে কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু এমবিবিএস (MBBS) পড়ার বিপুল খরচ সামলাতে না পেরে তাঁকে আবারও পড়াশোনা ছেড়ে দিতে হয়। তবে, বাবার বন্ধু ও শিক্ষকরা তাঁকে যে আর্থিক সাহায্য করেছিলেন, তা দিয়ে তিনি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েন এবং ডিগ্রি শেষ করে একটি বহুজাতিক কোম্পানিতে (MNC) ভালো মাইনের চাকরিও পেয়ে যান। কিন্তু ভাগ্য তাঁকে অন্যদিকে নিয়ে গেল।
বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত থাকাকালীনই বরুণ সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি সিভিল সার্ভিসে (Civil Service)-এ যোগ দেবেন। ইউপিএসসি (UPSC) পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিতে তিনি চাকরি ছেড়ে দেন। তাঁর এই চাকরি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তে সায় দেননি অনেকেই। কিন্তু বরুণ নিজের ওপর বিশ্বাস রেখেছিলেন। কোচিংয়ের খরচ বহন করতে পারেননি সেই সময়। তবে তিনি একটি প্রতিষ্ঠানে গিয়ে কথা বলেন, তাদের প্রতিশ্রুতি দেন যে যদি তারা তাঁকে বিনামূল্যে পড়ার সুযোগ করে দেন, তবে তিনি প্রথম চেষ্টাতেই ইউপি এসসি পাশ করবেন। আর তিনি তাঁর কথা রাখেনও ইউপিএসসি সিএসই ২০১৬ পরীক্ষায় ৩২তম (AIR) র্যাঙ্ক অর্জন করে আইএএস অফিসার হন বরুণ বারানওয়াল।










