আনিষা চৌধুরী, কলকাতা: দীর্ঘ ১৫ বছর পর প্রথমবার পশ্চিমবঙ্গের (West Bengal) প্রতিনিধিত্বে কেন্দ্রীয় জলশক্তি মন্ত্রকের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে যোগ দিল রাজ্য। দিল্লিতে কেন্দ্রীয় জলশক্তিমন্ত্রী সি আর পাটিলের সঙ্গে এই বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) ও রাজ্যের মুখ্যসচিব মনোজ আগরওয়াল উপস্থিত ছিলেন। এই বৈঠকে নদীভাঙন প্রতিরোধ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান এবং পানীয় জল সরবরাহ-সহ একাধিক বিষয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে রাজ্যের বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য কেন্দ্রের আর্থিক সাহায্য ও প্রয়োজনীয় অনুমোদনের বিষয়গুলিও তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী।
কী বললেন মুখ্যমন্ত্রী?
বৈঠকের পর শুভেন্দু অধিকারী জানান, আলোচনায় মূলত দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। প্রথমত, মালদহের কালিয়াচকের ভূতনিচর এলাকায় বন্যা ও নদীভাঙন প্রতিরোধে স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। আইআইটি কানপুরের নির্দেশিকা মেনে বিহার সরকারের সঙ্গে এ বিষয়ে পরিকল্পনা তৈরি হয়েছে। তবে প্রস্তাবিত কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে ঝাড়খণ্ড সরকারের অনাপত্তিপত্র বা এনওসি প্রয়োজন। সেই অনুমোদনের ব্যবস্থা করতে কেন্দ্রীয় জলশক্তিমন্ত্রী এবং গঙ্গা ফ্লাড কন্ট্রোল কমিশনের সহযোগিতা চেয়েছে রাজ্য। ফুলহর নদী সংলগ্ন এলাকাতেও নদীভাঙন প্রতিরোধের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
দ্বিতীয়ত, ফারাক্কা ব্যারাজ থেকে নদিয়ার দিকে বিস্তৃত এলাকায় নদীভাঙন প্রতিরোধের কাজ নিয়ে কেন্দ্রের কাছে আর্থিক সাহায্য চেয়েছে রাজ্য। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে ফারাক্কা ব্যারাজ কর্তৃপক্ষ, জাতীয় জলপথ কর্তৃপক্ষ এবং পশ্চিমবঙ্গের সেচ ও জলপথ দফতরের মধ্যে একটি চুক্তি হয়েছিল। সেই চুক্তি অনুযায়ী, ফারাক্কা ব্যারাজ কর্তৃপক্ষের ২০ কিলোমিটার এলাকায় ভাঙন প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ছিল। অন্যদিকে, প্রায় ৮০ কিলোমিটার এলাকায় নদিয়া পর্যন্ত কাজ করার দায়িত্ব ছিল রাজ্য সরকারের। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, ওই অংশে প্রয়োজনীয় কাজ হয়নি। তাই নতুন করে পরিকল্পনা তৈরি করে আর্থিক সাহায্য চাওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ৫০০ কোটি টাকা দেওয়ার বিষয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর নির্দেশের কথা জানিয়েছেন তিনি। তবে অর্থ ছাড়ের আগে ডিপিআর-সংক্রান্ত প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করতে হবে।
আরও পড়ুন: বিদ্রোহী সাংসদদের পদ খারিজের দাবি, অভিষেকের আবেদন শুনলই না সুপ্রিম কোর্ট
ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান নিয়েও বৈঠকে রাজ্যের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, কেন্দ্রীয় সরকারের বন্যা নিয়ন্ত্রণ খাতে বরাদ্দ অর্থ এবং রাজ্যের নিজস্ব তহবিল কাজে লাগিয়ে প্রায় ১,২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে চায় পশ্চিমবঙ্গ সরকার। দীর্ঘদিন ধরে ঘাটাল ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় বর্ষার সময় জল জমা এবং বন্যার সমস্যা মোকাবিলায় এই পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি, জল জীবন মিশনের কাজও বৈঠকে আলোচনায় এসেছে। প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ সংক্রান্ত ৪০৭টি মামলার পর্যালোচনা চলছে, যার মধ্যে ১৩৯টির নিষ্পত্তি হয়েছে। আদিবাসী পরিবার-সহ গ্রামীণ এলাকার প্রতিটি পরিবারের কাছে নলবাহিত পানীয় জল পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে প্রায় ৩৯ হাজার কোটি টাকার পরিকল্পনার বিষয়টিও উঠে এসেছে।
আরও পড়ুন: ক্লার্ক ও গ্রুপ ডি প্রার্থীদের ক্যাটাগরি সংশোধনের সুযোগ, বড় ঘোষণা WBCSSC-র
এ ছাড়াও, ক্ষুদ্র সেচ প্রকল্পে কেন্দ্র ও রাজ্যের যৌথ উদ্যোগে ১,৬০০ কোটি টাকার পরিকল্পনা, যার মধ্যে কেন্দ্রের ১,০০০ কোটি এবং রাজ্যের ৬০০ কোটি টাকা দেওয়ার কথা রয়েছে, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। প্রান্তিক কৃষকদের সেচের সুবিধা বাড়ানো এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য। অন্যদিকে, নমামি গঙ্গে প্রকল্পের অধীনে ১৯টি নিকাশি পরিশোধন কেন্দ্র বা এসটিপি তৈরির জন্য আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে জমি সংক্রান্ত প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করার পরিকল্পনা রয়েছে। ইতিমধ্যেই ১৮টি প্রকল্পের বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা পড়েছে বলে জানা গিয়েছে। সব মিলিয়ে, নদীভাঙন প্রতিরোধ থেকে বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং পানীয় জল ও সেচের পরিকাঠামো, একাধিক ক্ষেত্রে কেন্দ্রের সহযোগিতা ও আর্থিক বরাদ্দ নিশ্চিত করাই ছিল দিল্লির এই বৈঠকের অন্যতম লক্ষ্য।










