পেশায় নার্স, পাশে দাঁড়াত প্রতিবেশীদের অসুস্থতায়! চোরবাগানে পদপিষ্টে নিহত বৈদ্যবাটির শ্রীপর্ণা

Published:

Sriparna Poddar Chorbagan stampede

অনন্যা সরকার, হুগলি: সপ্তমীর আলোকোজ্জ্বল জমজমাট সন্ধ্যায় নেমে এল বিষাদের কালো ছায়া। উৎসবের আনন্দের মাঝে বহু পরিবার এখন প্রিয়জন হারানো বেদনায় জর্জরিত। ঘটনার অভিঘাতে শোকে মূহ্যমান হুগলির বৈদ্যবাটির এক পরিবারও। শনিবার, সপ্তমীর দিন বৈদ্যবাটির বাসিন্দা শ্রীপর্ণা পোদ্দার (২৭) উত্তর কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গাপূজার মণ্ডপে বিশৃঙ্খল ভিড়ের মধ্যে পদপিষ্ট (Chorbagan Stampede) হয়ে প্রাণ হারান। বন্ধুদের সঙ্গে নতুন পোশাক পরে ঠাকুর দেখতে দেখার উদ্দেশ্যে বেরিয়েছিলেন তিনি, কিন্তু সেই যাত্রাই হয়ে গেল তাঁর জীবনের শেষ যাত্রা। আত্মীয়-স্বজন থেকে পাড়া-প্রতিবেশী – সবারই চোখ এখন পরোপকারী মেয়েটির জন্য জলে ভরে উঠছে। 

পেশায় নার্স শ্রীপর্ণা প্রতিবেশীদের অসুখ-বিসুখে ঝাঁপিয়ে পড়তেন 

 শ্রীপর্ণা পোদ্দার ছিলেন টাটা মেডিকেল সেন্টারের একজন নার্স, মানুষের সেবা করাকেই তাঁর জীবনের ব্রত ও দায়িত্ব মনে করতেন। ২০২৫ সালের ১২ জুন কর্মজীবনের এই নতুন অধ্যায় শুরুর কথা তিনি সামাজিক মাধ্যমে ভাগ করে নিয়েছিলেন। লিখেছিলেন “I’m not lost, just on my way.” তাঁর পরিবারের সদস্য ও প্রিয়জনদের কাছে এখন এই কথাগুলোই আরও মর্মান্তিক হয়ে উঠেছে। একজন নার্স এবং বাবা-মায়ের একমাত্র কন্যা হিসেবে তাঁর অকাল প্রয়াণ বৈদ্যবাটির মালি বাগান এলাকাকে গভীর শোকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে।

জানা গেছে, সপ্তমীর সকালে প্যান্ডেল হপিংয়ের পরিকল্পনা নিয়ে শ্রীপর্ণা বৈদ্যবাটির বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন। বন্ধুদের সঙ্গে উত্তর কলকাতার বেশ কয়েকটি মণ্ডপ ঘুরে সন্ধ্যায় তিনি পৌঁছান চোরবাগান সর্বজনীন পূজা মণ্ডপে। প্রতিবেশীরা স্মৃতিচারণ করে জানান, শ্রীপর্ণা ছিলেন খুবই মিশুকে ও পরোপকারী, যিনি কোনো প্রতিবেশী অসুস্থ হলে সবার আগে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতেন। প্রতিবেশী হরিদাস চট্টোপাধ্যায় জানান, বিএসসি নার্সিং পাশ করে কিছুবছর হল কর্মজীবনে পা রেখেছিলেন শ্রীপর্ণা। 

আরও পড়ুন: ‘মণ্ডপ ভেঙে যাচ্ছে’; বলে মাইকিং, ‘পুলিশ ছিল না’; দাবি মহিলার! কী হয়েছিল চোরবাগানে?

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটের দিকে চোরবাগান সর্বজনীনের মণ্ডপের প্রস্থান পথের কাছে এই দুর্ঘটনা ঘটে। হঠাৎ করে শুরু হওয়া মুষলধারায় বৃষ্টি, সরু রাস্তা ও দর্শনার্থীদের প্রচণ্ড ভিড়ের কারণে সেখানে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। হুড়োহুড়ির মধ্যে বেশ কয়েকজন মানুষ নীচে পড়ে যান এবং পদদলিত হন। এই মর্মান্তিক ঘটনায় ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহতদের কলকাতা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। 

শ্রীপর্ণার মৃত্যুর খবর পেয়ে তাঁর বাবা-মা তৎক্ষণাৎ কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা হন। চাঁপদানির বিধায়ক দিলীপ সিং এই মর্মান্তিক ঘটনার কথা জানতে পেরে মৃতার বাড়িতে যান। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এই দুর্ঘটনায় মৃতদের পরিবারকে প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় ত্রাণ তহবিল থেকে মাথাপিছু ২ লক্ষ টাকা করে অনুদান দেওয়ার কথা ঘোষণা শনিবারই করেছেন। পাশাপাশি, প্রত্যেক আহতকে ৫০ হাজার টাকা করে দেওয়ার কথাও জানান। রাজ্য সরকার নিহত এবং আহতদের পরিবারকে যথাক্রমে ২৫ লক্ষ ও ৫ লক্ষ টাকা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। 

একটা উৎসবমুখর সন্ধ্যা কীভাবে এতগুলো পরিবারের জন্য আজীবন শোকের কারণ হয়ে উঠল, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। ভিড় নিয়ন্ত্রণ, প্যান্ডেলে ঢোকা ও বেরোনোর ব্যবস্থা এবং সামগ্রিক নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলো খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। ইতিমধ্যেই এই ঘটনার সাথে জড়িত ১২ জনকে আটক করা হয়েছে।

google button