অনন্যা সরকার, দিল্লি: জীবনে ব্যর্থতা দেখেননি, এরকম মানুষ পাওয়া দুষ্কর। লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য চড়াই-উৎরাই পেরোতেই হয়। দিল্লির আদিত্য চোপড়াও (Success Story of Aditya Chopra) নানা উত্থান-পতনের পর এখন নিজের লক্ষ্যের দিকে দৃপ্ত পদক্ষেপে এগিয়ে যাচ্ছেন। তিনি অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে পড়াশোনা করেছেন। তারপর তিন-তিনবার ইউপিএসসি পরীক্ষার ইন্টারভিউ পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছেও পাননি সাফল্য। এরপর কোটি টাকার বেতনের কর্পোরেট চাকরি পান। কিন্তু, সেই চাকরি ছেড়ে আদিত্য নিজের মতো করে কিছু করার সিদ্ধান্ত নেন। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে তিনি হরিয়ানার ফরিদাবাদে নিজের ব্যবসা শুরু করেন। তাঁর ব্র্যান্ডের নাম নুবো (Nubo), যা ইতিমধ্যেই বাজারে বেশ সাড়া ফেলে দিয়েছে। লক্ষ্য এখন ২০০ কোটি টাকার টার্নওভার। চলুন তাহলে জেনে নেওয়া যাক আদিত্য চোপড়ার এই সাফল্যের কাহিনীটি।
কোটি টাকার কর্পোরেট প্যাকেজ ছেড়ে ব্যবসা শুরু
আদিত্য চোপড়া দিল্লিতে বড় হয়েছেন। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক হওয়ার পর, তিনি দেশের সবচেয়ে কঠিন সিভিল সার্ভিস (UPSC Civil Service) পরীক্ষার জন্য তিন বছর ধরে প্রস্তুতি নেন। তিনি তিনবারই সাক্ষাৎকারের পর্ব পর্যন্ত পৌঁছালেও চূড়ান্ত তালিকায় জায়গা করে নিতে পারেননি। তিনি শীঘ্রই বুঝতে পারলেন যে তাঁর এই ব্যর্থতা যোগ্যতার অভাবে নয় বরং পরীক্ষার কঠিন প্রতিযোগিতার কারণেই হয়েছে। হাল ছেড়ে না দিয়ে, তিনি কর্পোরেট জগতের দিকে ঝুঁকে পড়েন। তিনি ট্রেফিসের মতো নামকরা আমেরিকান ইক্যুইটি রিসার্চ ফার্মে কাজ করেছেন। পরে, তিনি ‘সমগ্র’ নামক কনসাল্টিং ফার্মে যোগ দেন, যেখানে আট বছরের কর্মজীবনে তিনি অ্যাসোসিয়েট থেকে ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে উন্নীত হন। সেসময় তিনি আট অঙ্কের বার্ষিক বেতন পেতেন।
এছাড়াও, আদিত্য প্রাকৃতিক তন্তু দিয়ে তৈরি কার্পেট বিক্রির এক সফল রপ্তানি ব্যবসা শুরু করেছিলেন, যা থেকে তিনি মাসে প্রায় ৮.৫ লক্ষ টাকা আয় করতেন। তবে, তাঁর মন ছিল আরও বড় কোনো কাজের প্রতি। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে তাঁর পরিচিত মহলের মাধ্যমে মাইক্রোপ্লাস্টিক গবেষক অধ্যাপক ফে কুসেইরোর সাথে তাঁর পরিচয় হয়। তাঁর সাথে কথোপকথন করে জানতে পারেন, বোতল, খেলনা এবং প্লাস্টিকের পণ্যের কারণে ছোট শিশুদের শরীরে প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় অনেক বেশি মাত্রায় পিইটি মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশ করে। এটি তাদের স্নায়ুর বিকাশ ও সার্বিক স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
আরও পড়ুন: নিরক্ষর মা আবর্জনা কুড়িয়ে পড়িয়েছেন সন্তানকে, UPSC ক্র্যাক করে ছেলে আজ IFoS অফিসার
ভারতে বিক্রি হওয়া ৯০% টিথার (Teether) প্লাস্টিকের তৈরি। শিশুদের এই বিপদ থেকে রক্ষা করার জন্য আদিত্য তাঁর কার্পেটের ব্যবসা বন্ধ করে দেন। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে ফরিদাবাদ থেকে ১০০% ফুড-গ্রেড সিলিকন এবং কটন-পেপার দিয়ে তৈরি ‘সেফ বেবি’ ব্র্যান্ডটি চালু করেন। ব্র্যান্ডটি মাত্র দুটি টিথিং প্রোডাক্ট নিয়ে তার যাত্রা শুরু করেছিল। আজ, এই পণ্যগুলির সংখ্যা বেড়ে ১৫টি এসকেইউ (SKU)-তে পৌঁছেছে।
চীনা সাপ্লায়ার এবং ভারতীয় নির্মাতারা আদিত্যকে পরামর্শ দিয়েছিলেন যে, বেশিরভাগ ভারতীয় বাবা-মায়েরা দাম দিয়ে শিশুর পণ্য কিনতে পারবেন না, তাই উচিত হবে সস্তা প্লাস্টিক ব্যবহার করা। তবে, আদিত্য এই পরামর্শ উপেক্ষা করে গুণমান এবং সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেন। তাঁর ব্র্যান্ডের সমস্ত সিলিকন টিথার BIS IS 9873 মান অনুযায়ী বিপিএ (BPA), পিভিসি (PVC) এবং ভারী ধাতু মুক্ত। তবে, এই পণ্যগুলির চাহিদা শুধু দেশের বড় শহরগুলিতেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এখন, ইন্দোর, আগ্রা, কোহিমা, ভোপাল এবং জয়পুরের মতো ৭০০-এরও বেশি টিয়ার-২ এবং টিয়ার-৩ শহর থেকে ৬০-৬৫% বিক্রি হয়।
আরও পড়ুন: যে বাসে ভ্রমণ সেই বাসই বাজেয়াপ্ত করে শিরোনামে, কে IAS নরেন্দ্র সূর্যবংশী?
আদিত্যের ব্র্যান্ড এখনও পর্যন্ত ফ্লিপকার্ট, অ্যামাজন, ব্লিংকিট ও নিজস্ব ওয়েবসাইট (nubokind.com)-এর মাধ্যমে ২০,০০০-এর বেশি অর্ডার সরবরাহ করেছে। তবে, ৩০-৪০% বিক্রি কোনও বিজ্ঞাপন ছাড়াই, শুধুমাত্র লোকমুখে প্রচার ও বাবা-মায়েদের কমিউনিটির মাধ্যমে হয়। প্রতি মাসে কোম্পানিটির বিক্রি ২৫% হারে বাড়ছে এবং শীঘ্রই এবিটডা (EBITDA) পজিটিভ পর্যায়ে পৌঁছে যাবে বলে আশা করা যায়। আটজনের একটি ছোট দল নিয়ে আদিত্য আগামী ৬-৭ মাসের মধ্যে ০ থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের উদ্দেশ্যে করে ১৫টি নতুন পণ্য চালু করার লক্ষ্য রেখেছেন। দুবাইয়ের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে, তারপর যুক্তরাজ্য ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশের পরিকল্পনা নিয়ে ব্র্যান্ডটির পরবর্তী লক্ষ্য হল প্রতি মাসে ১ কোটি টাকা আয় করা। আগামী চার বছরের মধ্যে নুবোকে ২০০ কোটি টাকার কোম্পানিতে পরিণত করার লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছেন আদিত্য।










