অনন্যা সরকার, কলকাতা: পশ্চিম এশিয়ায় চলমান জ্বালানি সংকট ও হরমুজ প্রণালীর বন্ধের জেরে ভারত বিকল্প উৎস থেকে দ্রুত লিকুইফায়েড পেট্রোলিয়াম গ্যাস (LPG) সংগ্রহে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। এর ফলে বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের অন্যতম বৃহৎ এলপিজি সরবরাহকারী হয়ে উঠেছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে যেখানে মোট আমদানির মাত্র ৮ শতাংশ আমেরিকার কাছ থেকে এসেছিল, সেখানে এপ্রিলে তা বেড়ে প্রায় এক-তৃতীয়াংশে (৩২ শতাংশ) দাঁড়িয়েছে। এছাড়াও একাধিক দেশ থেকে এলপিজি সংগ্রহ বাড়িয়েছে ভারত, এর ফলে উপসাগরীয় দেশগুলির ওপর থেকে নির্ভরশীলতা কমেছে।
আমেরিকা এলপিজি সরবরাহে এক তৃতীয়াংশ জুগিয়েছে
ভারতের বৃহত্তম ক্রেডিট রেটিং এজেন্সি, ক্রিসিল (CRISIL)-এর একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এলপিজি-এর উৎস পরিবর্তনের মূল কারণ হল ২০২৫ সালের শেষের দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভারতের স্বাক্ষরিত বার্ষিক ২.২ মিলিয়ন বা ২২ লক্ষ মেট্রিক টন এলপিজি সরবরাহের চুক্তি। এটি দেশের মোট বার্ষিক এলপিজি আমদানির প্রায় ১০ শতাংশের সমান। অন্যদিকে, ইরান আবার ভারতের এলপিজি আমদানির তালিকায় ফিরে এসেছে এবং গত এপ্রিল মাসে মোট আমদানির প্রায় ৬ শতাংশ জোগান দিয়েছে। এর পাশাপাশি, নেদারল্যান্ডস, আর্জেন্টিনা, চিলি এবং ফ্রান্স থেকেও এলপিজি সংগ্রহ করেছে ভারত। এর ফলে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কুয়েত ও কাতারের মতো ঐতিহ্যবাহী সরবরাহকারীদের ওপর ভারতের নির্ভরতা অনেকটাই কমেছে।
ক্রিসিলের রিপোর্ট থেকে এও জানা গেছে যে, অনেকগুলি উৎস থেকে এলপিজি আমদানি করার ফলে পণ্য পরিবহনের খরচ ও ঝুঁকি (freight exposure) বেড়েছে এবং সাপ্লাই চেইন দীর্ঘ হয়েছে। আমেরিকা-ইরান সংঘাতের একটি নেতিবাচক প্রভাব হিসেবে এলপিজি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে এবং এর ফলে এর ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে যেখানে ৩.২ মিলিয়ন মেট্রিক টন ব্যবহার করা হচ্ছিল, সেখানে এপ্রিলে তা কমে ২.৪৭ মিলিয়ন মেট্রিক টনে নেমে এসেছে। জানিয়ে রাখি, ২০২৬ অর্থবর্ষে ভারতের এলপিজি ব্যবহার ৬ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড ৩৩.২ মিলিয়ন মেট্রিক টনে পৌঁছেছিল। কিন্তু সীমিত প্রাপ্যতা ও উচ্চমূল্যের কারণে চাহিদা কমে যাওয়ার ফলে ২০২৬ সালের মার্চ ও এপ্রিল মাসে এলপিজি ব্যবহার ১৩ শতাংশ এবং মে মাসে আরও ২০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
ক্রিসিলের রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, ব্যবহার নিম্নগামী হওয়ার পেছনে মূলত বাণিজ্যিক ও বৃহৎ পরিসরের (ইন্ডাস্ট্রি) এলপিজি গ্রাহকদের প্রধান ভূমিকা ছিল। যেখানে গৃহস্থালি পর্যায়ে ব্যবহারের ক্ষেত্রে মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে যথাক্রমে ৮ শতাংশ, ১১ শতাংশ ও ১৯ শতাংশ পতন দেখা গেছে, সেখানে বাণিজ্যিক ও শিল্প খাতে ব্যবহারের হার যথাক্রমে ৫৫ শতাংশ, ২৮ শতাংশ ও ২৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এবছর ফেব্রুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে ভারতে এলপিজি (LPG) আমদানির মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত, ‘সৌদি আরামকো কন্ট্রাক্ট প্রাইস’ (Saudi Aramco Contract Price) ৪৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, এর কারণ হল বাজারে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি এবং পরিবহনের খরচ (freight costs) বৃদ্ধি। তবে, এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব দেশের সাধারণ গ্রাহকদের ওপর সরাসরি ও সমানভাবে পড়েনি। প্রতিবেদনে এও উল্লেখ করা হয়েছে যে, ফেব্রুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে দিল্লিতে ১৪.২ কেজির ডোমেস্টিক সিলিন্ডারের দাম ৮৫৩ টাকা থেকে বেড়ে ৯৪২ টাকা (প্রায় ১০%) বাড়লেও, ১৯ কেজির বাণিজ্যিক সিলিন্ডারের দাম ১,৭৪১ টাকা থেকে বেড়ে ৩,১১৪ টাকা (৭৯ শতাংশেরও বেশি) বৃদ্ধি পেয়েছে।
আরও পড়ুনঃ চাকরি ছেড়ে খাঁটি ঘি-এর ব্যবসা, বছরে ৪৩ কোটি টাকা আয় IIM পাস গোবিন্দর
বাণিজ্যিক এলপিজির দাম বাজারের পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে বাড়লেও, গৃহস্থালি গ্রাহকদের ওপর মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কমই পড়েছে। কারণ সংগ্রহের খরচ বৃদ্ধির একটি অংশ তেল বিপণন সংস্থাগুলি নিজেরাই বহন করেছে। এর ফলে মার্চ থেকে মে মাসে এলপিজি খাতে মোট লোকসানের পরিমাণ প্রায় ২২,০০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।










