অনন্যা সরকার, কলকাতা: একসময় ভারতের এডটেক সেক্টরে বড় নাম হয়ে উঠছিল আনঅ্যাকাডেমি (Unacademy)। সম্প্রতি প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১,৮৯০ কোটি টাকায় আপগ্রাড (upGrad) সংস্থাটিকে অধিগ্রহণ করার পর থেকেই আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে আনঅ্যাকাডেমি। এই ডিলটি সংস্থাটির অন্যতম প্রাথমিক সহ-প্রতিষ্ঠাতা রোমান সাইনির (Success Story of Roman Saini) অসাধারণ কর্মজীবনকেও চর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। কীভাবে এই এডটেক জায়ান্টটিকে সাফল্যের শিখরে নিয়ে গিয়েছিলেন রোমান, আসুন তাঁর সেই যাত্রাটি সর্ম্পকে জেনে নেওয়া যাক।
ডাক্তারি, আইএএস ছেড়ে এসে আনঅ্যাকাডেমির সূচনা
রোমান সাইনি মাত্র ১৬ বছর বয়সে ডাক্তারির প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর তিনি নয়াদিল্লির অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিকেল সায়েন্সেস (AIIMS) থেকে এমবিবিএস ডিগ্রী অর্জন করেন। পড়াশোনার সম্পন্ন করে তিনি এইমসের জুনিয়র রেসিডেন্ট হিসেবে কিছু বছর কাজও করেন। তবে তাঁর শিক্ষা বা কর্মজীবন এখানেই থেমে যায়নি। মাত্র ২২ বছর বয়সেই ইউপিএসসি সিভিল সার্ভিস (UPSC Civil Service) পরীক্ষা প্রথম প্রচেষ্টাতেই ক্র্যাক করে ফেলেন রোমান। তাঁর সর্বভারতীয় র্যাঙ্ক (AIR) ছিল ১৮। মধ্যপ্রদেশ ক্যাডারে ২০১৪ সালের ব্যাচের একজন আইএএস অফিসার হিসেবে তিনি নিযুক্ত হন।
আইএএস অফিসার হওয়ার বছর দেড়েক পর রোমান সাইনি আইএএস-এর চাকরি থেকে পদত্যাগ করেন। সেই সময়ে তিনি অনলাইনে ইউপিএসসি পরীক্ষার্থীদের কোচিং দিতেন। এখান থেকেই তিনি প্রযুক্তির মাধ্যমে শিক্ষা নিয়ে কাজ করার অনুপ্রেরণা পান। এরপর, তিনি গৌরব মুঞ্জল এবং হেমেশ সিং-এর সাথে মিলে আনুষ্ঠানিকভাবে এডটেক কোম্পানি, আনঅ্যাকাডেমির সূচনা করেন।
আরও পড়ুন: বাবার ক্যান্সার, মা সেলাই করে চালান সংসার, অভাবকে সঙ্গী করে NEET ক্র্যাক, ডাক্তার হবেন সাগর
আনঅ্যাকাডেমির যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০১০ সালে। সেসময় গৌরব মুঞ্জল ইউটিউবে শিক্ষামূলক ভিডিও আপলোড করতে শুরু করেন। এই উদ্যোগই ২০১৫ সালে গিয়ে একটি ব্যবসায় পরিণত হয়। মুঞ্জল, রোমান সাইনি এবং হেমেশ সিং মিলে কোম্পানিটিকে আরও বড় করে তোলেন। কোম্পানির মূল মডেল ছিল ভার্চুয়াল ক্লাস। অর্থাৎ, একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রযুক্তির মাধ্যমে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সংযুক্ত করা। প্রথমদিকে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাগুলির জন্য কোচিং দেওয়া হয়। পরে প্ল্যাটফর্মটিতে আইআইটি-জেইই (IIT-JEE), নিট (NEET) সহ অন্যান্য পরীক্ষার জন্য ছাত্র-ছাত্রীদের প্রস্তুত করা হত। এডটেকের জোয়ারে সেসময় আনঅ্যাকাডেমির সাফল্য ও খ্যাতি প্রতিনিয়ত বাড়তেই থাকে। ২০২১ সালের মধ্যেই কোম্পানিটি ভারতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় এডটেক কোম্পানিতে পরিণত হয়।
২০২১ সালের আগস্টে কোম্পানিটি টেমাসেক (Temasek Holdings)-এর নেতৃত্বে সিরিজ এইচ ফান্ডিং-এ ৪৪০ মিলিয়ন ডলার ফান্ডিং জোগাড় করতে সক্ষম হয়। এর ফলে, আনঅ্যাকাডেমির ভ্যালু ৩.৪৪ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৩২,৬২৮ কোটি টাকায় পৌঁছায়। ততদিনে, কোম্পানিটি মোট প্রায় ৮৬০ মিলিয়ন ডলারের ফান্ড সংগ্রহ করে নিয়েছে। ক্রিয়েট্রিক্স (Kreatryx), প্রেপল্যাডার (PrepLadder) কোডশেফ (CodeChef) এবং কোর্স্যাভি (Coursavy)-এর মতো কোম্পানিগুলোকেও অধিগ্রহণ করে ব্যবসার সম্প্রসারণ করেছে।
আরও পড়ুন: ঝাড়খণ্ডের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি! স্কলারশিপ পেয়ে অসাধ্য সাধন শ্রমিকের মেয়ের
কোভিড-১৯ মহামারীর সময় লকডাউনে অনলাইন শিক্ষার চাহিদা দ্রুতহারে বাড়ছিল এবং এর থেকে আনঅ্যাকাডেমিও প্রচুর লাভবান হয়। রোমান সাইনি বলেন, কোম্পানির প্রাইম টাইমে প্ল্যাটফর্মে প্রতি মাসে ১ লক্ষেরও বেশি লাইভ ক্লাস হত এবং প্রায় ১০ লক্ষ পেইড সাবস্ক্রাইবার ছিল। রোমানের মতে, প্রাথমিকভাবে ভালো অনলাইন শিক্ষকদের প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা একটা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। প্রথম মাসে তিনি ফোন করে প্রায় ২০০ জনকে অনলাইনে পড়ানোর জন্য রাজি করানোর চেষ্টা করেছিলেন বলে জানান।
তবে, কোভিড লকডাউনের পর, অফলাইন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলির বাড়বাড়ন্তে অনলাইন শিক্ষার চাহিদা ক্রমশ কমতে থাকে, যা আনঅ্যাকাডেমির ব্যবসা বৃদ্ধিকেও প্রভাবিত করে। অবশেষে আপগ্রাড সম্প্রতি এই কোম্পানিটিকে ২০০ মিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি বা প্রায় ১,৮৯০ কোটি টাকায় অধিগ্রহণ করেছে। এই মূল্য কোম্পানিটির ২০২১ সালের সর্বোচ্চ ৩.৪৪ বিলিয়ন ডলার ভ্যালুর তুলনায় কিছুই না।










