আনিষা চৌধুরী, কলকাতা: দুর্গাপুজোয় (Durga Puja) কলকাতার (Kolkata) মণ্ডপ মানেই কি শুধু দেবী দর্শন? না, একেবারেই নয়। একটি মণ্ডপ মানে শিল্প, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সমাজের নানা দিককে নতুন করে চেনার সুযোগ। কোথাও বাংলার সাংস্কৃতিক পরিচয় উঠে আসছে পদ্মের প্রতীকে, কোথাও স্বাধীনতা সংগ্রামের স্মৃতি, আবার কোনও মণ্ডপে গুরুত্ব পাচ্ছে নদীদূষণ ও পরিবেশ রক্ষার বার্তা। ২০২৬ সালের দুর্গাপুজোয় শহরের একাধিক মণ্ডপের শিল্পকার্যে দেখা যাচ্ছে এমনই বৈচিত্র্যের সম্ভার। তাই এই বছর যদি ঠাকুর দেখার পরিকল্পনা থাকে, তাহলে শুধু জনপ্রিয়তার নিরিখে নয়, বরং থিমের বিষয়বস্তু বিবেচনা করে চটপট লিস্টটা বানিয়ে ফেলুন।
ঐতিহ্য ও স্থাপত্যের মেলবন্ধন
সাবেকি দুর্গাপুজোর আবহ পেতে চাইলে উত্তর কলকাতার বাগবাজার সর্বজনীন এবং দক্ষিণ কলকাতার ম্যাডক্স স্কোয়ার রাখা যেতে পারে তালিকায়। থিমের চাকচিক্যের বাইরে এই দুই পুজোর পরিচিতি তৈরি হয়েছে মূলত ঐতিহ্য, প্রতিমার সাবেকি রূপ এবং উৎসবের চেনা আবহকে ঘিরে। অন্যদিকে, একডালিয়া এভারগ্রিনের এবারের মণ্ডপের ভাবনায় রয়েছে গুজরাটের ঐতিহাসিক সোমনাথ মন্দিরের স্থাপত্য। ফলে একই পুজো পরিক্রমায় চিরাচরিত সাবেকিয়ানার সঙ্গে অন্য অঞ্চলের স্থাপত্য শিল্পের পরিচয়ও মিলতে পারে।
নিউ টাউন সর্বজনীনের ‘পদ্ম-ভূষণ’ থিমেও রয়েছে বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার এক মহৎ ভাবনা। শিল্পী রিন্টু দাসের পরিকল্পনায় পদ্মকে কেন্দ্র করে মণ্ডপসজ্জার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে ঐতিহ্য ও শিল্পকলার দৃষ্টিকোণ থেকে এই পুজোটিও দর্শনার্থীদের তালিকায় জায়গা করে নিতে পারে।
স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শিল্পের ইতিহাস
সন্তোষ মিত্র স্কোয়ারের ‘বন্দে মাতরম’ থিমে গুরুত্ব পাচ্ছে জাতীয়তাবাদ এবং স্বাধীনতা সংগ্রামীদের স্মৃতি। অন্যদিকে, সন্তোষপুর ত্রিকোণ পার্কের ‘প্রকৃতি’ থিমে পরিবেশবান্ধব উপাদানের ব্যবহারকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দুটি থিমের বিষয়বস্তু আলাদা হলেও, মণ্ডপসজ্জার মধ্য দিয়ে দর্শনার্থীদের সামনে বৃহত্তর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভাবনা তুলে ধরার চেষ্টা রয়েছে।
গঙ্গা নদীর অবস্থা, প্রকৃতির সংকট ও কয়লাখনির কঠিন বাস্তবতা
পরিবেশের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে উত্তর ও দক্ষিণ কলকাতার পুজোয় একাধিক মণ্ডপ তৈরি করা হয়েছে। নলিন সরকার স্ট্রিটের ‘জললিপি’ থিমে উঠে আসছে গঙ্গার ইতিহাস, নদীদূষণ এবং প্লাস্টিক ব্যবহারের সমস্যা। পরিবেশবান্ধব উপকরণ ব্যবহারের পাশাপাশি স্থানীয় মৃৎশিল্পী, তরুণ ও দিনমজুরদের অংশগ্রহণের কথাও এই প্রকল্পের বিবরণে স্থান করে নিয়েছে।
রাজডাঙা নব উদয় সংঘের ‘শোধন’ থিমে দেখানো হচ্ছে প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করে চলা যন্ত্রনির্ভর সভ্যতার আসন্ন মর্মান্তিক পরিণতি। বনভূমি ধ্বংসের পর কৃত্রিম ব্যবস্থার সাহায্যে অক্সিজেনের জোগান দেওয়ার মতো পরিস্থিতির কাল্পনিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
অন্যদিকে, ঠাকুরপুকুর এসবি পার্কের ‘কলিয়ারি’ থিমে কয়লাখনির জগৎ ও শ্রমিকদের জীবনসংগ্রামকে সামনে আনা হচ্ছে। শিল্পায়নের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই কঠিন বাস্তবতা মণ্ডপের মূল আকর্ষণ। ফলে এই তিনটি পুজোয় পরিবেশ, নদী এবং শিল্পের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে সুন্দরভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।
বিশ্বাস, দৈনন্দিন জীবন ও সামাজিক সম্পর্ক
বেহালা ক্লাবের ‘তেল দ্য মার্কেট অফ ফেইথ’ থিমে একটি সাধারণ উপাদানকে কীভাবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয় এবং সেটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটাই তুলে ধরা হচ্ছে। পরিচিত একটি উপাদানকে কেন্দ্র করেও কীভাবে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের ছবি তুলে ধরা যায়, সেই ভাবনাটাই এই পুজোর বিশেষত্ব।
আরও পড়ুন: দ্বিগুণ হবে রাজ্যের কর্মীদের বেতন, অষ্টম বেতন কমিশন নিয়ে বিরাট সুখবর
সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের এই মণ্ডপগুলিতে রয়েছে ভিন্ন স্বাদের শিল্পগাঁথা। কোথাও সাবেকি ঐতিহ্য, কোথাও স্থাপত্য ও জাতীয়তাবাদের স্মৃতি, আবার কোথাও পরিবেশ ও শ্রমজীবী মানুষের জীবন। তবে সব ঠাকুর একদিনে দেখে ফেলতে গেলে সমস্যায় পড়তে হতে পারে। তাই উত্তর কলকাতার পুজোগুলি একদিনে এবং দক্ষিণ কলকাতার মণ্ডপগুলি অন্য দিনে রাখলে যাতায়াতের পরিকল্পনা করতে সুবিধা হবে।










