UNESCO-র বিশ্ব ঐতিহ্যের সম্ভাব্য তালিকায় যুক্ত হল ভারতের আরও চার ঐতিহাসিক স্থান

Published:

UNESCO Tentative List

অনন্যা সরকার, কলকাতা: বিশ্ব ঐতিহ্যের মানচিত্রে নিজেদের সাংস্কৃতিক উপস্থিতি আরও জোরদার করার লক্ষ্যে ভারত এগোলো আরও  কয়েক ধাপ। ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের ‘সম্ভাব্য তালিকা’য় (UNESCO Tentative List) আরও চারটি স্থান যুক্ত হয়েছে। আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ, আসাম এবং রাজস্থান জুড়ে বিস্তৃত এই নতুন সংযোজনগুলির ফলে সম্ভাব্য তালিকায় বর্তমানে ভারতের অন্তর্ভুক্ত স্থানের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ালো ৭৩। এর মধ্যে ৫৩টি সাংস্কৃতিক, তিনটি মিশ্র এবং ১৭টি প্রাকৃতিক নিদর্শন বা স্থান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। নতুন চারটি স্থান হল – আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের ঔপনিবেশিক অপরাধমূলক বন্দিশালা, মধ্য নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের নিকোবারি সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা, রংপুর-শিবসাগর ঐতিহাসিক স্থাপত্যসমাহার এবং শেখাওয়তির চিত্রিত হাভেলি-শহর। এই চার স্থানের অন্তর্ভুক্তি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য অনুসারে কোনো স্থানকে মনোনীত করার ক্ষেত্রে ‘সম্ভাব্য তালিকা’-টি হল প্রথম বাধ্যতামূলক ধাপ। 

১. আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের ঔপনিবেশিক অপরাধমূলক বন্দিশালা

আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের ঔপনিবেশিক দণ্ডমূলক বন্দিশালাটি বা ‘কালাপানি’ ঐতিহাসিকভাবে চারটি স্থানকে সংযুক্ত করে, এগুলি হল – সেলুলার জেল, চ্যাথাম দ্বীপ, ভাইপার দ্বীপ এবং নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু দ্বীপ (আগে রস দ্বীপ নামে পরিচিত)। এই ঐতিহাসিক স্থানটি ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ-পরবর্তী সময়ে ব্রিটেনের ঔপনিবেশিক দণ্ডদান ব্যবস্থার বিবর্তনকে তুলে ধরে। ১৯০৬ সালে নির্মিত সেলুলার জেল ব্রিটিশদের দমন-পীড়নের সাথে সাথে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম শক্তিশালী প্রতীকে পরিণত হয়। ইউনেস্কোর মনোনয়ন নথিতে রাজনৈতিক বন্দী ও স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সাথে এই সম্পূর্ন বন্দিশালাটির সম্পর্কের কথা বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

২. নিকোবরি সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা সংরক্ষণ

‘নিকোবরি সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা’ সম্পর্কিত এই প্রস্তাবনাটিতে নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের কেন্দ্রীয় গোষ্ঠীতে নিকোবরি সম্প্রদায়ের জীবন্ত সাংস্কৃতিক নিদর্শন সর্ম্পকে বর্ণনা করা হয়েছে। এতে ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যশৈলী, বসতি, সামাজিক কাঠামো এবং উপকূলীয় পরিবেশের সাথে দীর্ঘদিনের সম্পর্কের বিষয়গুলোকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। প্রচলিত স্মৃতিসৌধ বা স্থাপত্যের চেয়ে এর গুরুত্ব মূলত একটি জীবন্ত আদিবাসী সাংস্কৃতিক ব্যবস্থার ধারাবাহিকতার মধ্যেই রক্ষিত আছে। 

আরও পড়ুন: মালদায় ১৫০ বছরের প্রাচীন শিব মন্দির টেনে নিন গঙ্গা, কান্নায় ভেঙে পড়লেন গ্রামবাসী

৩.আসামের আহোম ঐতিহ্য

রংপুর-শিবসাগরের ঐতিহাসিক স্থাপত্যকলাটি আহোম রাজ্যের স্থাপত্য ও প্রকৌশলগত দক্ষতার প্রতিনিধিত্ব করে। আসামের শিবসাগর জেলায় অবস্থিত এই স্থানটি রংপুর ও শিবসাগরের ঐতিহাসিক দৃশ্যপটকে আগলে রেখেছে। এর মধ্যে রয়েছে – তালাতল ঘর ও রং ঘরের মতো বিশাল সব স্থাপত্যকাঠামো, পাশাপাশি রাজপ্রাসাদ, অনুষ্ঠানের স্থান এবং জল ব্যবস্থাপনার একটি বৃহৎ ও উন্নত ব্যবস্থা। প্রস্তাবিত এই স্থানটি নগর পরিকল্পনা, স্থাপত্য এবং হাইড্রোলিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ক্ষেত্রে আহোম রাজবংশের দৃষ্টিভঙ্গি ও দক্ষতার সাক্ষ্য বহন করে। ইউনেস্কো গত ১৯ জুন রংপুর-শিবসাগর এলাকাটিকে তাদের ‘টেনটেটিভ লিস্ট’-এ অন্তর্ভুক্ত করেছে।

আরও পড়ুন: বেসরকারিকরণ সম্পূর্ণ গুজব ও ভিত্তিহীন, বিবৃতি জারি করে জানাল ISRO

৪. শেখাওয়াতির চিত্রশোভিত শহরগুলি

রাজস্থানের শেখাওয়াতি অঞ্চলের চিত্রশোভিত ‘হাভেলি’ বা ঐতিহাসিক অট্টালিকাগুলি সংরক্ষিত  আছে চুরু, ঝুনঝুনু এবং সিকার জেলার ১৪টি শহরে। মূলত ধনী মারওয়ারি ব্যবসায়ীদের পৃষ্ঠপোষকতায় অষ্টাদশ থেকে বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের গড়ে ওঠা এই শহরগুলি তাদের চমৎকার চিত্রকর্ম-শোভিত হাভেলির জন্য বিখ্যাত। এখানকার ফ্রেস্কো (Frescoes) বা দেওয়ালচিত্রগুলোতে নানা পৌরাণিক কাহিনী, ঐতিহাসিক ঘটনা, দৈনন্দিন জীবনযাত্রা, এমনকি কলকারখানা, রেলপথ ও যন্ত্রপাতির মতো প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের চিত্রগুলিও বিশেষ শৈলীর মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। 

ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ টেন্টেটিভ লিস্টে এই চারটি নতুন স্থানের সংযোজন ভারতের ঐতিহ্যের বিশাল বৈচিত্র্য ও ব্যাপ্তিকে তুলে ধরে। এরমধ্যে ঔপনিবেশিক ইতিহাস ও স্থানীয় জীবন্ত ঐতিহ্য থেকে শুরু করে বণিক-শ্রেণির শিল্পকলা ও রাজকীয় স্থাপত্য – সবই অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

আরও India UNESCO