অনন্যা সরকার, কলকাতা: উমা আসবেন বাপের বাড়ি (Durga Puja)। তাঁকে আহ্বান করার জন্য চারিদিকে এখন প্রস্তুতি তুঙ্গে। চার সন্তানকে সাথে নিয়ে পাঁচদিন দিনের জন্য মা আসছেন মর্ত্যলোকে। কৈলাসে একাই থাকবেন দেবাদিদেব মহাদেব (Shiva)। এই কাহিনী ছোট থেকেই আমাদের মনে গাঁথা হয়ে গেছে। বাপের বাড়িতে মা দুর্গা সন্তানদের নিয়ে আসেন, সঙ্গে থাকেন না ভোলানাথ। তাই পুজো মণ্ডপগুলিতে মায়ের দুই পাশে লক্ষ্মী, গণেশ, কার্তিক সরস্বতী বিরাজমান থাকলেও দেখা মেলে শিবের। কিন্তু সত্যিই কি তিনি অনুপস্থিত থাকেন? প্রতিমার দিকে ভালো করে দেখলেই এক ভিন্ন চিত্র চোখে পড়ে। মা তো একা নয়, ঠিক তাঁর মাথার ওপর, চালচিত্রের একেবারে কেন্দ্রে শান্ত ও সৌম্য ভঙ্গিমায় অধিষ্ঠান করেন স্বয়ং মহাদেব। তবে কী স্ত্রীয়ের সাথে এসেছেন তিনিও? চালচিত্রের মাঝে মহাদেবের এই উপস্থিতির পেছনে রয়েছে গভীর পৌরাণিক ও আধ্যাত্মিক কাহিনী। চলুন জেনে নেওয়া যাক।
কেন মায়ের মাথার ওপর বিরাজ করেন শিব
এই পৌরাণিক কাহিনী শিব ও শক্তির অবিচ্ছেদ্য বন্ধনের কথা বর্ণনা করে। পুরাণ ও তন্ত্রশাস্ত্রে বলা হয়েছে যে, শিব ও শক্তি একে অপরের থেকে আলাদা করা যায় না, কারণ তাঁরা একে অপরের পরিপূরক। শাস্ত্র অনুযায়ী, শিব হলেন পুরুষ, পরম সত্তা বা চেতনার প্রতীক। আর দুর্গা হলেন প্রকৃতি, সর্বশক্তির আধার। পুরুষ ছাড়া প্রকৃতি অসম্পূর্ণ, তাই শক্তির প্রতিমূর্তি মা দুর্গার আরাধনা শিবকে ছাড়া সম্পূর্ণ হয়না।
কৈলাস ছেড়ে মর্ত্যলোকে আসার পরও উমা তাঁর স্বামীর জন্য ব্যাকুল থাকেন। তাই তাঁদের এই অটুট ভালবাসা, চিরন্তন বন্ধনকে সম্মান জানাতে মহাদেবকে চালচিত্রে চিত্রিত করা হয়। দেবী দুর্গা বাপের বাড়ি আসলেও, শিব সর্বদা তাঁর সাথেই থাকেন। এই চিরকালীন বিশ্বাসকে বাংলার শিল্পীরা তাঁদের শিল্পকর্মের মাধ্যমে জীবন্ত করে তোলেন। তাঁদের এই বন্ধনকে তুলে ধরতে চালচিত্রে মহাদেবের চিত্রাঙ্কন অপরিহার্য বলে মনে করা হয়।
আরও পড়ুন: মহালয়ার ইডেনের অনুষ্ঠানে থাকছেন না মোদি-শাহ, অনুষ্ঠানে বদল আনছে সরকার
কিন্তু এখন অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে যে, শিবকে মা দুর্গার পাশে না রেখে ঠিক ওপরে কেন স্থাপন করা হয়? এর পিছনেও একটি নির্দিষ্ট কারণ রয়েছে। মহাদেব সংযম, প্রশান্তি, স্থিরতার প্রতীক, অন্যদিকে দেবী দুর্গা সর্বোচ্চ ঐশ্বরিক শক্তির মূর্ত প্রতীক। তাই চালচিত্রে মহাদেব একজন নীরব পর্যবেক্ষকের মতো শান্ত ও ধ্যানমগ্ন ভঙ্গিতে অধিষ্ঠান করেন। তাঁর ঠিক নীচে, শক্তির প্রতিমূর্তি দুর্গা তাঁর অসীম মহিমায় অশুভ শক্তিকে বিনাশ করেন। বিশ্বাস করা হয়, মহাদেবের আশীর্বাদ না পেলে এই অশুভ শক্তির বিনাশ অসম্ভব। তাই চালচিত্রের এই নকশাটি নিছক অলঙ্করণ নয়, তার থেকেও বেশি কিছু। এটি একটি গভীর দর্শন এবং চিরস্থায়ী দাম্পত্য বন্ধনের বার্তাকে তুলে ধরে।










