গুরুদক্ষিণা মাত্র ১ টাকা, অবসরের পর স্কুলের উন্নয়নে সব বিলিয়ে দেন কালনার শিক্ষক

Published:

Retired Kalna teacher Gangadhar Paul

অনন্যা সরকার, পূর্ব বর্ধমান: আজ শিক্ষক দিবস (Teachers’ Day)। আজকের দিনে তাই শিক্ষার্থীরা তাঁদের শিক্ষাগুরুদের শ্রদ্ধা ও সম্মান জানাতে নানান আয়োজনে ব্যস্ত। কেউ  সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের শেষ মুহূর্তের মহড়া সারছেন, আবার কেউ পছন্দের টিচারের জন্য সেরা উপহারটা বেছে নিচ্ছেন। শিক্ষক-শিক্ষিকারা আমাদের জীবনে একটা বিশাল জায়গা জুড়ে থাকেন। মা বাবার পরের স্থানটাই শিক্ষাগুরুর। একজন প্রকৃত শিক্ষক তাঁর সবটুকু উজাড় দেন ছাত্রছাত্রীদের জীবন ও চরিত্র গঠনে জন্য। আজ তাই এই বিশেষ দিনে শোনাবো এমনই এক শিক্ষকের কথা, যাঁর কাছে শিক্ষকতা শুধুই পেশা নয়, একটি আজীবন ব্রত।  তাই অবসরের পরেও শিক্ষাদান থামামনি। তিনি হলেন পূর্ব বর্ধমান জেলার কালনা মহকুমার কুতুবপুর মাধ্যমিক শিক্ষা কেন্দ্রের শিক্ষক গঙ্গাধর পাল। ২০২৩-এর অক্টোবর মাসে অবসর গ্রহণের পরেও তিনি নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসেন এবং ছাত্রছাত্রীদের ক্লাস নেন। প্রায় তিন বছর ধরে একই ধারা বজায় রেখেছেন। ষাটোর্ধ্ব গঙ্গাধর বাবু জানান, এই বিদ্যালয় ও ছাত্রছাত্রীরাই তাঁর কাছে সব।

নামমাত্র গুরুদক্ষিণায় শিক্ষাদান ও স্কুলের উন্নতিতেও বড় অবদান

ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে থাকতেই সবথেকে বেশি ভালোবাসেন গঙ্গাধর পাল। তবে তাঁর অবদান শুধু অবসরের পর ক্লাস নেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি নিজের বেতন থেকে মাত্র এক টাকা নিতেন, সেই এক টাকাই ছিল তাঁর গুরু-দক্ষিণা। আর বাকি টাকা স্কুলের উন্নয়নের জন্য সঞ্চয় করতেন। স্কুলের যখন শ্রেণীকক্ষ, শৌচাগারের মেরামতের প্রয়োজন হয়েছে, কিংবা আরও আসবাব, লাইব্রেরি, পানীয় জল বা আলোর প্রয়োজন হয়েছে, তখন তিনি এগিয়ে এসে নিজের সাধ্যমতো সাহায্য করেছেন। 

সকলের প্রিয় মাস্টারমশাইয়ের এই মানসিকতার পেছনের প্রধান অনুপ্রেরণা ছিলেন তাঁর মা।  গঙ্গাধর বাবুর স্মৃতিচারণা করে বলেন, তাঁর মা তাঁকে বলেছিলেন যে তাঁদের কোনো আর্থিক কষ্টের নেই, কিন্তু তিনি যে স্কুলে পড়ান সেখানকার অনেক ছাত্রছাত্রীরই বই-খাতা কেনার সামর্থ্য নেই। তাই তিনি সংকল্প করেছিলেন যে, সুযোগ পেলেই তিনি ওই ছাত্রদের জন্য কিছু করবেন, তাঁর মায়ের সেই উপদেশ আজও গঙ্গাধর বাবুর জীবনের পাথেয় হয়ে রয়েছে। 

আর পড়ুন: স্যার/ম্যাডামকে এভাবে করুন উইশ, রইল ৩০টি মন ছুঁয়ে যাওয়া শিক্ষক দিবসের শুভেচ্ছা বার্তা

কুতুবপুর মাধ্যমিক শিক্ষা কেন্দ্রের বর্তমান প্রধান শিক্ষক সৌমিত্র বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, এটি সত্যিই তাঁর একটি মহৎ উদ্যোগ। অবসর নেওয়ার পরেও স্কুলে শিক্ষকের অভাব তাঁর কাছে উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। তাই তিনি নিজের সঞ্চয় থেকে ছয় লক্ষ টাকা আলাদা করে সরিয়ে রেখেছিলেন, এই টাকা ওপর থেকে পাওয়া সুদ থেকে বর্তমানে স্কুলের দুজন শিক্ষককে বেতন দেওয়া হচ্ছে। যদিও তাঁরা সরকার কর্তৃক নিযুক্ত নন, তবু তিনি ছাত্রদের স্বার্থে এভাবে এগিয়ে এসেছেন। ছাত্ররা মাষ্টারমশাইয়ের এই উদ্যোগের সুফল পাচ্ছে। অবসর গ্রহণের তিন বছর কেটে গেছে। তবু একজন শিক্ষক কীভাবে তাঁর স্কুল এবং ছাত্রদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছেন, তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলেন গঙ্গাধর পাল। এই শিক্ষক দিবসের দিন এমন এক শিক্ষককে কুর্নিশ জানাতেই হয়।