আনিষা চৌধুরী, কলকাতা: আর মাত্র কয়েকদিনের অপেক্ষা। তারপরই শুরু বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপুজো (Durga Puja)। পুজোর পোশাক থেকে শুরু করে খাওয়াদাওয়া সব নিয়েই জোরকদমে চলছে প্রস্তুতি পর্ব। তবে এর মাঝেই পুজোয় বাঙালির পাতে কী থাকবে, তা নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে। বাগেশ্বর ধামের ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রীর দুর্গাপুজোর সময়ে আমিষ খাবার না খাওয়ার নিদানকে কেন্দ্র করেই তৈরি হয়েছে এই বিতর্ক। তাঁর মন্তব্যের পর রাজনৈতিক মহলে অনেকেই তাঁর কথায় সম্মতি জানিয়েছে, আবার অনেকে বিরোধিতাও করেছে।
দুর্গাপুজোয় মাছ-মাংস খাওয়ার চল কেন?
বাংলার দুর্গাপুজোর সঙ্গে আমিষ খাবারের সম্পর্ক একেবারে নতুন নয়। বহু পরিবারে পুজোর দিনগুলিতে মাছ, মাংস রান্না করার রীতি রয়েছে। আবার এমন পরিবারও আছে, যেখানে অষ্টমী বা অন্য কোনও নির্দিষ্ট দিনে নিরামিষ খাওয়ার নিয়ম মানা হয়। অর্থাৎ গোটা বাংলায় কোনও একটি নির্দিষ্ট খাদ্যরীতি নেই। পরিবার, সম্প্রদায় এবং স্থানীয় প্রথা অনুযায়ী বদলে যায় নিয়ম। বিজয়া দশমীর দিন মাছ খাওয়ার রীতিও বহু বাঙালি পরিবারে দেখা যায়। এগুলির কোনটাই ধর্মীয় বিধান হিসেবে স্বীকৃত নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দুর্গাপুজোও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের পাশাপাশি সামাজিক মিলন এবং খাওয়াদাওয়ার উৎসব হয়ে উঠেছে।
বাঙালির ঐতিহ্যে আমিষের জায়গা কোথায়?
বাঙালির দুর্গাপুজোকে কিন্তু দেশের অন্যান্য অঞ্চলে পালিত নবরাত্রির সঙ্গে পুরোপুরি এক করে দেখা যায় না। নবরাত্রির বহু ধারায় উপবাস, সংযম এবং নিরামিষ খাবারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। অন্যদিকে বাংলার তান্ত্রিক ঐতিহ্যের কিছু ধারায় মাছ, মাংস এবং পশুবলির উল্লেখ রয়েছে। কালিকা পুরাণের মতো ধর্মগ্রন্থেই নির্দিষ্ট আচার মেনে বলির বিধানের কথা পাওয়া গিয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে সব দুর্গাপুজোয় আমিষ ভোগ বা পশুবলি হয়। বহু পুজোয় সম্পূর্ণ নিরামিষ ভোগ দেওয়া হয়। আবার কোথাও প্রতীকী বলি হিসেবে কুমড়ো, লাউ বা নারকেল ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ শাক্তধারার মধ্যেও নিয়ম এক নয়। কিছু প্রথায় ছাগল বা মহিষ বলির রীতি রয়েছে এবং সেই বলির মাংস প্রসাদ হিসেবে বিতরণের চলও দেখা যায়। বাংলার পাশাপাশি অসম ও নেপালের কিছু ধর্মীয় ঐতিহ্যেও এই রীতির উপস্থিতি রয়েছে।
কালী, দুর্গা থেকে কামাখ্যা, কোথায় রয়েছে বলির প্রথা?
দেবী কালীকে ঘিরে পশুবলির ঐতিহ্য সবচেয়ে বেশি পরিচিত। কলকাতার কালীঘাট মন্দিরের হাড়িকাঠ পশুবলির সঙ্গে যুক্ত একটি ঐতিহাসিক স্থান। পূর্ব ভারতের কিছু শাক্ত দুর্গাপুজোয়ও ছাগবলি দেওয়ার রীতি রয়েছে, যদিও তা সর্বত্র প্রচলিত নয়। অসমের কামাখ্যা মন্দিরের কিছু তান্ত্রিক আচারেও পশুবলির ঐতিহ্য রয়েছে। এই রীতিগুলির পেছনে শুধু খাদ্যাভ্যাস নয়, শাক্ত দর্শনের একটি বিশেষ ভাবনাও কাজ করে। তন্ত্রে জগতের কোনও অংশকে শুধুমাত্র গ্রহণযোগ্য বা বর্জনীয় হিসেবে দেখার বদলে মানুষের কামনা, ভয়, জীবন ও মৃত্যুর মতো অভিজ্ঞতাকেও সাধনার অংশ হিসেবে দেখা হয়। সেই কারণেই নির্দিষ্ট তান্ত্রিক আচারে মাছ বা মাংসের ব্যবহারকে সাধারণ ভোজনের সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক নয়। শাক্ত দর্শনে সৃষ্টি ও ধ্বংস প্রকৃতির দুই দিককেই স্বীকার করার প্রমাণ রয়েছে। বলির ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট ধর্মীয় নিয়ম মেনে উৎসর্গের কথা বলা হয়েছে এবং কিছু ধর্মীয় বিশ্বাসে উৎসর্গ করা প্রাণীর আধ্যাত্মিক মুক্তির ধারণাও পাওয়া গিয়েছে।
আরও পড়ুন: নেই স্বামী, অন্নপূর্ণার ৩০০০-ই ভরসা, দুই মেয়েকে নিয়ে দিন কাটছে ঘাটালের মহিলার
তাহলে নবরাত্রিতে নিরামিষ, দুর্গাপুজোয় আমিষ কেন?
এই পার্থক্যের অন্যতম কারণ হল আঞ্চলিক ধর্মীয় ঐতিহ্য। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে নবরাত্রির রীতি আলাদা। অনেক জায়গায় নিরামিষ খাবার, উপবাস এবং সংযমকে উৎসবের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হয়। বাংলায় আবার দুর্গাপুজোর সঙ্গে শাক্ত-তান্ত্রিক প্রভাব, স্থানীয় খাদ্যসংস্কৃতি এবং পারিবারিক রীতির দীর্ঘ সম্পর্ক রয়েছে। তাই বাঙালির দুর্গাপুজোয় কোথাও নিরামিষ ভোগ, কোথাও মাছের আয়োজন, আবার কোথাও মাংস রান্নার রীতি দেখা যায়। ফলে পুজোয় আমিষ খাওয়াকে শুধু ধর্মীয় নির্দেশ হিসেবে ব্যাখ্যা করা যেমন ঠিক নয়, তেমনই একে নিছক সাধারণ খাবারের বিষয় বলেও পুরো ছবিটা বোঝা যায় না। এটি ধর্মীয় ঐতিহ্য, আঞ্চলিক সংস্কৃতি, পারিবারিক রীতি এবং বাঙালির দীর্ঘদিনের খাদ্যাভ্যাস সব মিলিয়ে তৈরি একটি প্রথা। শেষ পর্যন্ত পুজোয় কে মাছ-মাংস খাবেন আর কে নিরামিষ খাবেন, সেই সিদ্ধান্ত পরিবার ও ব্যক্তির নিজস্ব রীতির ওপরই নির্ভর করে। চলতি বিতর্কের মধ্যেও বাংলার বহু রকমের এই ঐতিহ্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।










