আনিষা চৌধুরী, কলকাতা: নতুন করে গঠিত হল সংসদের বিভিন্ন বিভাগের স্থায়ী কমিটি। শনিবার রাজ্যসভার (Rajya Sabha) চেয়ারম্যান সি পি রাধাকৃষ্ণণ এবং লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার সিদ্ধান্তে ২০২৬-২৭ সালের জন্য একাধিক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির পুনর্গঠন করা হয়েছে। এই রদবদলে তৃণমূল কংগ্রেসের (Trinamool Congress) দুই গুরুত্বপূর্ণ কমিটির চেয়ারপার্সন পদ হারানো বিষয়টি বিশেষভাবে নজরে এসেছে।
কাদের ছেঁটে ফেলা হলো?
বাণিজ্য বিষয়ক সংসদীয় কমিটির দায়িত্বে থাকা তৃণমূল সাংসদ দোলা সেনের জায়গায় আনা হয়েছে বিজেপির সাংসদ সুধাংশু ত্রিবেদীকে। অন্য দিকে, রাসায়নিক ও সার বিষয়ক সংসদীয় কমিটির চেয়ারপার্সন কীর্তি আজাদকে সরিয়ে সেই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কাকলি ঘোষদস্তিদারকে। কাকলি বর্তমানে তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদদের নিয়ে তৈরি ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া বা এনসিপিআই-এর সঙ্গে রয়েছেন।
অর্থাৎ, নতুন কমিটি গঠনের পর তৃণমূলের হাতে থাকা দুই চেয়ারপার্সন পদের আর একটিও অবশিষ্ট থাকল না। তবে শুধু এই দুই কমিটিতেই পরিবর্তন হয়নি। বিভিন্ন কমিটির ক্ষেত্রে পুরনো চেয়ারপার্সনদেরই বহাল রাখা হয়েছে। ফলে সামগ্রিকভাবে কমিটি পুনর্গঠনে ধারাবাহিকতাও বজায় রয়েছে।
কারা বহাল, কারা পেলেন নতুন দায়িত্ব?
শিল্প বিষয়ক সংসদীয় কমিটির চেয়ারপার্সন হিসেবে ডিএমকে-র তিরুচি শিবা এবং খাদ্য, উপভোক্তা বিষয়ক ও গণবণ্টন সংক্রান্ত কমিটির চেয়ারপার্সন হিসেবে কে কানিমোঝি নিজেদের দায়িত্বে বহাল রয়েছেন। বিদেশ বিষয়ক কমিটির দায়িত্বে ফেরানো হয়েছে কংগ্রেসের শশী তারুরকে। কৃষি বিষয়ক কমিটির চেয়ারপার্সন হিসেবেও চরণজিৎ সিংহ চান্নি বহাল রয়েছেন।
বিরোধী দলের আরও কয়েকজন সাংসদও তাঁদের দায়িত্বে থেকে গিয়েছেন। শিক্ষা, মহিলা, শিশু, যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক কমিটির চেয়ারপার্সন হিসেবে কংগ্রেসের মুকুল ওয়াসনিক এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ বিষয়ক কমিটির দায়িত্বে সমাজবাদী পার্টির রামগোপাল যাদব রয়েছেন।
বিজেপির ক্ষেত্রেও একাধিক পুরনো মুখকে দায়িত্বে রাখা হয়েছে। কয়লা, খনি ও ইস্পাত বিষয়ক কমিটির চেয়ারপার্সন অনুরাগ ঠাকুর, যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক কমিটির নিশিকান্ত দুবে এবং স্বরাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির রাধামোহন দাস আগরওয়াল তাঁদের পদে বহাল রয়েছেন। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক কমিটির দায়িত্বেও মেধা বিশ্রাম কুলকার্নি রয়েছেন।
এনডিএ-র শরিক দলগুলির কয়েকজন সাংসদকেও সংশ্লিষ্ট কমিটির চেয়ারপার্সন পদে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, পুনর্গঠনের পর সব কমিটির নেতৃত্বে কিন্তু আমূল পরিবর্তন হয়নি, নির্দিষ্ট কয়েকটি কমিটিতেই মূল পরিবর্তন ঘটেছে।
রেল সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির ক্ষেত্রেও চেয়ারপার্সন বদল হয়েছে। বিজেপির সি এম রমেশের জায়গায় দায়িত্ব পেয়েছেন দলেরই সাংসদ সুধীর গুপ্ত। অন্যদিকে, বাণিজ্য কমিটির পাশাপাশি কর্মী, জনঅভিযোগ, আইন ও বিচার বিষয়ক কমিটির নেতৃত্বেও পরিবর্তন হয়েছে বলে পুনর্গঠিত তালিকায় উল্লেখ রয়েছে।
এই রদবদলের পিছনে তৃণমূলের সংসদীয় শিবিরে সাম্প্রতিক ভাঙনের ঘটনাটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের পর তৃণমূলের অন্দরে বিদ্রোহের সূত্রপাত হয়। পরে সেই অসন্তোষ সংসদীয় দলেও ছড়িয়ে পড়ে। জুনে তৃণমূলের ২৮ জন লোকসভা সাংসদের মধ্যে ২০ জন বিদ্রোহী সাংসদ ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া বা এনসিপিআই-তে মিশে যাওয়ার কথা ঘোষণা করেন। কাকলি ঘোষদস্তিদার ও সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ওই সাংসদরা লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার সঙ্গে দেখা করে পৃথক ভাবে বসার ব্যবস্থা নেন এবং এনসিপিআই-এর সদস্য হিসেবে স্বীকৃতির দাবি জানান। তাঁদের বক্তব্য ছিল, ২০ জন সাংসদ তৃণমূলের লোকসভা সদস্যসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশের বেশি।
ওই সময় কাকলি ঘোষদস্তিদার জানিয়েছিলেন, তাঁরা এনসিপিআই-তে যোগ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন এনডিএ-কে সমর্থন করবেন। বিষয়টি নিয়ে তৃণমূলের তরফে অবশ্য ভিন্ন অবস্থান জানানো হয়েছিল এবং বিদ্রোহী সাংসদদের আলাদা গোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়ার আবেদন করা হয়েছিল।
পরবর্তী সময়েও এই সাংসদদের নিয়ে সংসদীয় স্তরে বিতর্ক চলেছে। ১৯ জুলাইয়ের আগে লোকসভা স্পিকার তাঁদের এনসিপিআই-তে একীভূত হওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন বলে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল। একই সময়ে বিদ্রোহী সাংসদদের পৃথক আসনের ব্যবস্থাও করা হয়েছিল।
আরও পড়ুন: পুজোয় প্রেমিকাকে আইফোন উপহার দিতে দোকানে চুরি, বাদকুল্লায় আটক ২
এই পটভূমিতেই এ বার সংসদীয় স্থায়ী কমিটির পুনর্গঠনে কাকলি ঘোষদস্তিদার রাসায়নিক ও সার বিষয়ক কমিটির চেয়ারপার্সনের দায়িত্ব পেলেন। একই সঙ্গে তৃণমূলের দোলা সেনের জায়গায় বাণিজ্য কমিটির দায়িত্বে এলেন বিজেপির সুধাংশু ত্রিবেদী। ফলে কমিটি পুনর্গঠনের তালিকায় তৃণমূলের দুই পুরনো চেয়ারপার্সন পদের পরিবর্তনই সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।










