অনন্যা সরকার, কলকাতা: আধার (Aadhaar Card) হল ভারতের বায়োমেট্রিক ডেটাবেস, যা একটি শক্তিশালী যাচাইকরণের ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে। তবে যখন ১৫০ কোটিরও বেশি মানুষের তথ্য ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন ওঠে তখন যেকোনও ব্যবস্থাতেই ত্রুটি হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। আধারও এর ব্যতিক্রম নয়। তাই মাঝে মাঝেই নকল আধার কার্ড ব্যবহার করে অপরাধমূলক বা বেআইনি কাজ করার অভিযোগ উঠে আসে। ২০২২ সালে সরকার লোকসভায় প্রকাশ করেছিল যে, সেবছর মে মাসের মধ্যে প্রায় ৬ লক্ষ নকল আধার কার্ড বাতিল করা হয়েছে। আর এখন, এই সমস্যার সমাধানের জন্য ইউআইডিএআই (UIDAI)-এর বিশেষজ্ঞরা ভারত এবিআইএস (Bharat ABIS) নামে একটি নতুন ওপেন-সোর্স বায়োমেট্রিক সিস্টেম তৈরি করেছেন, যা শুধু নকল তথ্য প্রতিরোধই করবে না, তার পাশাপাশি আঙুলের ছাপ নষ্ট হওয়ার মতো সাধারণ সমস্যাগুলোরও সমাধান করবে।
কীভাবে কাজ করে ভারত এবিআইএস প্রযুক্তি?
এবিআইএস (ABIS)-এর পূর্ণরূপ হলো অটোমেটেড বায়োমেট্রিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম (Automated Biometric Identification System)। এটি আসলে একটি ওপেন-সোর্স, মাল্টি-মোডেল বায়োমেট্রিক প্ল্যাটফর্ম, যা একজন ব্যক্তির আঙুলের ছাপ, চোখের মণি ও মুখের বিবরণের তথ্য একত্রিত করে মাত্র ১৩.৫ কিলোবাইট আকারের একটি সিঙ্গেল ডিজিটাল টেমপ্লেট তৈরি করে। এই টেমপ্লেটটিকে আগের রেকর্ডের সাথে তুলনা করে যাচাই করা যায় যে, ওই ব্যক্তির আগে থেকেই কোনও আইডি আছে কি না।
এই সিস্টেমের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল, এর ইন্টেলিজেন্ট সিস্টেম। একাধিক সার্ভারে সিস্টেমের লোড ভাগ করে দেওয়ার মাধ্যমে, এটি একই সাথে লক্ষ লক্ষ মানুষের ডেটা যাচাই করার সময় সিস্টেমকে হ্যাং হওয়া থেকে রক্ষা করে। এছাড়াও, আঙুলের ছাপ, মণি বা মুখের ডেটা একত্রিত করার ফলে যেকোনো ধরনের ভুল হওয়ার সম্ভাবনা দূর হয়ে যায়।
আরও পড়ুন: কাউন্টার বা এটিভিএম নয়, এবার চলন্ত অবস্থায় হাতেই ট্রেনের টিকিট! নয়া ব্যবস্থা পূর্ব রেলের
এই সিস্টেম তৈরিতে অবদান রয়েছে ইউআইডিএআই-এর ছয়জন গবেষকের, যার মধ্যে আইআইটি হায়দ্রাবাদের একজন গবেষকও রয়েছেন। মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির প্রখ্যাত বায়োমেট্রিক্স গবেষক অনিল জৈনও এই প্রজেক্টের অংশ ছিলেন। ভারত এবিআইএস সিস্টেমটিকে ১ লক্ষ থেকে ২ লক্ষ পরিচয়বিহীন ডেটাসেটের ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এবং এটিকে ২ লক্ষ ২০ হাজার আধার রেকর্ডের একটি গ্যালারির ওপর পরীক্ষা করা হয়।
সূত্রের খবর, ২ কোটি রেকর্ডের ওপর পরীক্ষায় অত্যন্ত নির্ভুল এবং দ্রুত প্রমাণিত হয়েছে এই সিস্টেমটি। ভারত এবিআইএস-এ একটি আসল আইডিকে নকল হিসেবে শনাক্ত করার হার ছিল মাত্র ০.১%। আর একটি নকল কার্ডকে চিনতে না পারার ঝুঁকি ছিল মাত্র ০.০৫%। এর গতি সম্পর্কে বললে, ৮টি এনভিডিয়া এইচ১০০ জিপিইউ এবং ২ টেরাবাইট র্যামযুক্ত একটিমাত্র সার্ভার মাত্র ১ সেকেন্ডে ৪ কোটি রেকর্ডের মধ্যে ১০০টি অনুসন্ধান সম্পন্ন করতে পারে।
আরও পড়ুন: আদৌ গুণ্ডা দমন বিল ফেরত পাঠিয়েছেন রাষ্ট্রপতি? জানিয়ে দিল সরকার
কারা উপকৃত হতে চলেছেন এই প্রযুক্তি থেকে?
ভারত এবিআইএস সিস্টেম বয়স্ক ব্যক্তি এবং শ্রমজীবী মানুষদের জন্য উপকারী হবে, যাদের আঙুলের ছাপ ঘষে বা ঝাপসা হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। এর ফলে রেশন বা পেনশন পাওয়ার সময় আঙুলের ছাপ না মেলার সমস্যায় পড়েন তারা। এবিআইএস সিস্টেমের নতুন প্রযুক্তি এই মুছে যাওয়া আঙুলের ছাপগুলোও সহজেই শনাক্ত করতে পারবে, যার ফলে আঙুলের ছাপ অমিলের সমস্যা অর্ধেকের নীচে নেমে যাবে। এছাড়াও, সারা বিশ্বে প্রায় ১৬০টি ছোট দেশ রয়েছে, যারা ব্যয়বহুল সিস্টেম কেনার সামর্থ্য রাখে না, তারা এই বিনামূল্যের প্রযুক্তিটি ব্যবহার করতে পারবে। তবে ভারতে এই সিস্টেম চালু হওয়ার আগে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে।










