একদিকে যখন ভোট যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে তৃণমূল-বিজেপি-সিপিএম, ঠিক সেই মুহূর্তেই এক নতুন যুদ্ধ শুরু করেছেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে, এই যুদ্ধ কিন্তু কোনও দল বা নির্বাচন কমিশনের সাথে নয়, এই যুদ্ধ ভারতের সাংবিধানিক প্রধান তথা রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মূ-র সাথে (President VS Chief Minister)।
এত বছর ধরে বাংলা দেখেছে, দেশের প্রধানমন্ত্রীর সাথে মুখ্যমন্ত্রীর লড়াই, রাজ্যপালের সাথে মুখ্যমন্ত্রীর লড়াই। আর এবার প্রথমবার বাংলা দেখছে রাষ্ট্রপতির সাথে মুখ্যমন্ত্রীর লড়াই।
গত ১০ দিন কেটে গেলেও, এই যুদ্ধ যেন থামার নামই নিচ্ছে না। দুপক্ষই যেন বলছে – হাম ঝুঁকেগা নেহি! পরিস্থিতি এমন যে তৃনমূলের আচরণে ভয়ঙ্কর ক্ষুব্ধ ভারতের রাষ্ট্রপতি, এমনকি রাষ্ট্রপতি শাসনও জারি হতে পারে বাংলায়।
কিন্তু, হঠাৎ কীভাবে শুরু হল এই যুদ্ধ? কেনই বা একে অপরের সাথে ঠাণ্ডা লড়াইয়ে নেমেছে ভারতের দুই ক্ষমতাধারী মহিলা? হঠাৎ কী এমন করল তৃণমূল যার জন্য তেলে বেগুনে জ্বলে উঠেছেন স্বয়ং রাষ্ট্রপতি? কেন সারা ভারতের সামনে লজ্জার মুখে পড়তে হচ্ছে বাঙালীদেরকে?
আজ India Hood ডিকোড-এ আমরা তুলে ধরবো এমন কিছু ঘটনা, যা আমার-আপনার ধারণারও বাইরে! তাই ধৈর্য ধরে লেখাটি শেষ পর্যন্ত প্ড়ুন।
দ্বন্দের সূত্রপাত!
দিনটা ছিল ৬ই মার্চ। রাষ্ট্রপতি হওয়ার প্রায় চার বছর পর প্রথমবার উত্তরবঙ্গ সফরে আসেন দ্রৌপদী মুর্মু। দুই দিনের সফর। প্রথম দিন তিনি পৌঁছান বাগডোগরা বিমানবন্দরে। সেখান থেকে যান লোকভবনে। সেখানে তাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি ছিল – দার্জিলিং হিল ফেস্টিভ্যালের উদ্বোধন। সেই দিন রাত কাটান রাজভবনে।
পরের দিন অর্থাৎ ৭ই মার্চ, রাষ্ট্রপতির যাওয়ার কথা ছিল বিধাননগরে। সেখানে আদিবাসী সম্প্রদায়ের একটি বড় অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার কথা ছিল তাঁর। প্রথমে বিধাননগরে এই অনুষ্ঠান হওয়ার কথা থাকলেও, নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে পরে সেই অনুষ্ঠান সরিয়ে আনা হয় গোঁসাইপুরে।
আর এই দিন থেকেই শুরু হয় বিতর্ক।
প্রথমে গোঁসাইপুরের মঞ্চ থেকেই রাষ্ট্রপতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এরপর নিজেই চলে যান বিধাননগরে, খতিয়ে দেখেন – কেন বিধাননগরে তাঁকে অনুষ্ঠান করতে দেওয়া হল না, কোন নিরাপত্তার কারণে তাঁর এই অনুষ্ঠান স্থানান্তর করা হল।
কিন্তু কোনও কারণ না খুঁজে পেয়ে, এরপর সেখান থেকেই তিনি সমালোচনা করা শুরু করেন রাজ্য সরকারের। তিনি বলেন – “প্রশাসনের মনে কী চলছিল জানি না। আমি তো সহজেই এখানে চলে এলাম। ওরা বলেছিল জায়গা নেই। অথচ এখানে তো পাঁচ লক্ষ লোক হয়ে যাওয়ার কথা!”
এরপর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্দেশে তিনি বলেন – “আমিও বাংলার মেয়ে। আমাকে বাংলায় আসতেই দেওয়া হয় না। মমতাদি আমার ছোট বোন। জানি না আমার উপর কী রাগ।”
এখানেই থামেননি ম্যাডাম প্রেসিডেন্ট। রাজ্যের আদিবাসী সমাজের অবস্থা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তিনি বলেন, “দেখে মনে হচ্ছে না যে সাঁওতাল বা আদিবাসী সমাজের মানুষেরা সমস্ত সরকারি সুযোগ-সুবিধা পান।“
এছাড়াও, কোনও রাজ্যে রাষ্ট্রপতি এলে সাধারণ প্রোটোকল অনুযায়ী, রাজ্যের রাজ্যপাল, মুখ্যমন্ত্রী, এবং মন্ত্রিসভার সদস্যরা তাঁকে অভ্যর্থনা জানান বা সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। কিন্তু, ঘটনাচক্রে এই সময়ে ধর্মতলায় SIR-এর প্রতিবাদে ধর্না দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাই তিনি রাষ্ট্রপতির সাথে দেখাও করেননি। যা নিয়েও অনেকে মুখ্যমন্ত্রীকে খোঁচা দেন।
রাষ্ট্রপতির এই বক্তব্য ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ভাইরাল হয়ে যায় সোশ্যাল মিডিয়ায়। এই মন্তব্যের পরেই বিষয়টি রাজ্য রাজনীতির গণ্ডি ছাড়িয়ে জাতীয় রাজনীতিতে পৌঁছে যায়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এই বিষয় নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, – “এটি লজ্জাজনক এবং নজিরবিহীন। গণতন্ত্রে বিশ্বাসী প্রত্যেক মানুষ এই ঘটনায় ব্যথিত। পশ্চিমবঙ্গ সরকার রাষ্ট্রপতির প্রতি অসম্মান দেখিয়েছে। রাষ্ট্রপতির পদ রাজনীতির ঊর্ধ্বে। এই পদের মর্যাদা সর্বদা রক্ষা করা উচিত।“
এরপর পাল্টা জবাব দেয় মুখ্যমন্ত্রী!
এত কিছুর পর এবার পাল্টা জবাব দিতে মাঠে নামেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ধর্মতলার ধর্নামঞ্চ থেকেই তিনি বলেন – “মাননীয়া রাষ্ট্রপতি, আমি দুঃখিত। আপনার প্রতি আমার শ্রদ্ধা আছে। কিন্তু আপনি বিজেপির নীতির ফাঁদে পড়ে গিয়েছেন।” মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেন, “রাষ্ট্রপতিকে বিজেপি তাদের রাজনৈতিক প্রচারের জন্য ব্যবহার করছে। কই মণিপুরে যখন আদিবাসী সমাজের উপর হামলা হচ্ছিল, তখন রাষ্ট্রপতি কোনও মন্তব্য করেননি কেন?“
এছাড়া, SIR নিয়ে মমতা, রাষ্ট্রপতিকে বলেন, ‘‘SIR নিয়ে কই একটা কথাও বললেন না তো? কত আদিবাসীর নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, সেই খবর রেখেছেন? খোঁজ নিয়ে নিন, আমরা আদিবাসীদের জন্য কী কী করেছি। অন্য রাজ্য কী করেছে।‘’
এরপর ওই দিনই, ধর্না মঞ্চ থেকে তৃণমূল কংগ্রেস সিদ্ধান্ত নেয়, ‘’রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করবে তাদের প্রতিনিধি দল। মুখ্যমন্ত্রী দায়িত্ব দেন তৃণমূলের দুই শীর্ষ সাংসদ—ডেরেক ও’ব্রায়েন এবং সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়কে। তাঁদের বলা হয় রাষ্ট্রপতির কাছে গিয়ে জানাতে—পশ্চিমবঙ্গে আদিবাসী উন্নয়নের জন্য রাজ্য সরকার কী কী কাজ করেছে।
এছাড়াও, মোদীর কটাক্ষের উত্তর দিতে গিয়ে একটি পুরনো ছবি দেখিয়ে তৃণমূলের তরফ থেকে দাবি করা হয়, রাষ্ট্রপতিকে অসম্মান করেছেন স্বয়ং মোদীও। যে ছবিতে দেখা যাচ্ছে, রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী দাঁড়িয়ে লালকৃষ্ণ আদবানীকে ভারতরত্ন পুরষ্কার দিচ্ছেন। আর তাঁর সামনে একটি চেয়ারে বসে রয়েছেন মোদী। পাশাপাশি তৃণমূলের নেতারা বক্তৃতায় জুড়ে দেন রামমন্দির উদ্বোধনে রাষ্ট্রপতিকে আমন্ত্রণ না-জানানোর প্রসঙ্গও।
কিন্তু, বিজেপিও এর পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানায়। তারা সোশ্যাল মিডিয়া এই ঘটনার ব্যাখ্যা দিয়ে বলে – ভারতরত্ন পুরস্কার প্রদানের সময় সরকারী প্রোটোকল অনুসারে, উপস্থিত অন্যরা বসে থাকবেন। তাই এক্ষেত্রে কোনও ধরণের ভঙ্গিমা লঙ্ঘন করা হয়নি।“ পোস্টটিতে আরও বলা হয়, “এটা লজ্জাজনক যে তৃণমূল কংগ্রেস আবারও মাননীয়া রাষ্ট্রপতি শ্রীমতি দ্রৌপদী মুর্মু, প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদী এবং ভারতরত্ন শ্রী লালকৃষ্ণ আদভানির সাথে জড়িত একটি মর্যাদাপূর্ণ মুহূর্তকে তুচ্ছ রাজনীতির জন্য বিকৃত করার চেষ্টা করছে।”
এছাড়া রাষ্ট্রপতির সাথে দেখা না করার ক্ষেত্রে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার জন্য, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ৭ই মার্চ রাতেই এক্স হ্যান্ডলে লেখেন, “রাষ্ট্রপতির কর্মসূচির আয়োজক ‘আন্তর্জাতিক সাঁওতাল কাউন্সিল’, যারা একটি বেসকরকারি সংস্থা। সেই কর্মসূচির বিষয়েও রাষ্ট্রপতির সচিবালয়ের সঙ্গে জেলা প্রশাসন সমন্বয়ও রেখেছিল। সেখানেই বিধাননগরের পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না থাকার কথা জানানো হয়। এছাড়াও, শিলিগুড়ির মেয়র, দার্জিলিংয়ের জেলাশাসক সকলেই রাষ্ট্রপতিকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য হাজির ছিলেন। সেখানে কোনও প্রোটোকল বিঘ্নিত হয়নি। শেষে তিনি লেখেন, ‘‘সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক হল, বিজেপি নিজেদের দলীয় উদ্দেশ্যে দেশের সর্বোচ্চ পদকেও ব্যবহার করছে।‘’
তবে, এই রাজনৈতিক সংঘর্ষ এখানেই থেমে থাকেনি।
“মুখের ওপর না” বলে দেয় রাষ্ট্রপতি!
এরপর দিনটা ৯ই মার্চ। রাষ্ট্রপতির সাথে দেখা করার জন্য তৃনমূলের তরফ থেকে রাষ্ট্রপতি ভবনে চিঠিও পাঠানো হয়। ১২ থেকে ১৫ জন দলীয় প্রতিনিধি রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করবেন বলে চিঠিতে জানানো হয়েছিল। সেই প্রতিনিধি দলে থাকার কথা তৃণমূল সাংসদ এবং মন্ত্রীদের।
কিন্তু, ১২ই মার্চ সেই আবেদন খারিজ করে দেওয়া হয়। এক প্রকার “মুখের ওপর তৃনমূলকে না বলে দেয়” রাষ্ট্রপতি। তৃণমূলের চিঠির জবাবে রাষ্ট্রপতি ভবন জানায়, তাদের অনুরোধটি বিবেচনা করা হয়েছিল। কিন্তু সময়ের অভাবে আবেদন গ্রহণ করা যাচ্ছে না। এর পরেই আগামী সপ্তাহে ফের রাষ্ট্রপতির সময় চান তৃণমূল সাংসদেরা।
এবার পাল্টা “না” বলে তৃণমূল!
এবার পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে থাকে। ১৪ই মার্চ শুরু হয় নতুন বিতর্ক। কারণ, সেদিন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু সমস্ত রাজনৈতিক দলের সাংসদদের ১৬ই মার্চ রাষ্ট্রপতি ভবনে প্রাতরাশের আমন্ত্রণ জানানো হয়। কিন্তু সেই আমন্ত্রণ ফিরিয়ে দেয় তৃণমূল কংগ্রেস। দলের রাজ্যসভার মুখ্যসচেতক নাদিমুল হক রাষ্ট্রপতি ভবনকে জানান, “তৃণমূলের সাংসদরা এই অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন না।“
কিন্তু কেন? কারণ হিসেবে বলা হয়—রমজান মাস চলছে। মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষেরা দিনভর উপবাস করেন। তাই সেই সময় প্রাতরাশ অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া ঠিক হবে না।
আর এই সিদ্ধান্তই নতুন করে বিতর্ক তৈরি করে। কারণ প্রশ্ন ওঠে, – যদি সকালে না যেতে চান, তাহলে কখন যাবেন তারা? কারণ বিকালে দেখা করতে বললে, – তখন তো আবার ইফতার চলে!
বিরোধীরা বলছে—এটা আসলে রাজনৈতিক প্রতিবাদ। অন্যদিকে তৃণমূলের দাবি—বিজেপি রাজনৈতিক স্বার্থে রাষ্ট্রপতির পদ ব্যবহার করছে।
যদিও পরে দেখা যায়, রাষ্ট্রপতি ভবনের ওই প্রাতরাশের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে রাষ্ট্রপতির সাথে দেখা করেন তৃনমূলের বর্ষীয়ান সাংসদ সৌগত রায়।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে – এই ঠাণ্ডা লড়াইয়ের কতটা প্রভাব পড়বে বাংলার ভোটে?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন—সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে জঙ্গলমহল এলাকায়।
কারণ, ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে জঙ্গলমহলের সবকটি আসন জিতেছিল বিজেপি। কিন্তু ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে সেই অঞ্চল অনেকটাই পুনর্দখল করে তৃণমূল। আর ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে পশ্চিমাঞ্চলের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ আসন—বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম এবং মেদিনীপুর—দখল করে নেয় তৃণমূল।
তাই আদিবাসী ভোট এখন দুই দলের কাছেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পরিসংখ্যান বলছে – পশ্চিমবঙ্গে মোট ২৯৪টি বিধানসভা আসনের মধ্যে ১৬টি আসন জনজাতিদের জন্য সংরক্ষিত। কিন্তু বাস্তবে প্রায় ৫২টি আসনে উল্লেখযোগ্য আদিবাসী ভোট রয়েছে। অর্থাৎ, এই বিতর্ক শুধু সংরক্ষিত আসনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং বৃহত্তর রাজনৈতিক সমীকরণেও এর প্রভাব পড়তে পারে। তাই এখন প্রশ্নটা শুধু একটি অনুষ্ঠান বা একটি বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
এই সংঘর্ষ কি শেষ পর্যন্ত প্রভাব ফেলবে বাংলার ভোটে? আপনার কী মনে হয়? জানাতে ভুলবেন না আপনার মতামত কমেন্ট করে।












